ঢাকা, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৩৭:৫০ AM

বাংলাদেশ–চীন করিডোর ঘিরে কৌশলগত বিতর্ক

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
27-06-2026 09:28:25 PM
বাংলাদেশ–চীন করিডোর ঘিরে কৌশলগত বিতর্ক

বেইজিং: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের দিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদি আমিন জানান, বৈঠকে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভূতকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোর (BMCC)। প্রস্তাবিত এই করিডোরের মাধ্যমে মিয়ানমার হয়ে সড়ক ও রেলপথে বাংলাদেশের সঙ্গে মূল ভূখণ্ড চীনের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীন চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর আধুনিকায়নের আগ্রহও প্রকাশ করেছে। বেইজিং চট্টগ্রাম বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করতে চায়। পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোরও প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোর থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে চীন।

তিনি বলেন, করিডোরটি চালু হলে চীন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন কৌশলগত পণ্য পরিবহনের জন্য একটি বিকল্প পথ পাবে। এর ফলে মালাক্কা প্রণালীর ওপর তাদের নির্ভরতা কমবে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী করবে।

তার মতে, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এ প্রকল্পকে শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখবে না; বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করবে। চীনের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির যেকোনো উদ্যোগ ওয়াশিংটনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তবে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ভর করবে করিডোরটির প্রকৃতি, অবকাঠামোর ব্যবহার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এতে সামরিক বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (Dual-use) সুবিধা যুক্ত হয় কি না—এসব বিষয়ে।

যদি প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সীমিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এটি যদি সামরিক বা কৌশলগত মাত্রা লাভ করে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তবে একই সঙ্গে দেশকে অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।