শেষ পর্ব
সকালটা আজও একই রকম।
নদীর পাশের বাতাস, দূরের পাখির ডাক, আর মাটির ভেজা গন্ধ—সবই আগের মতো। তবু এই সকাল আর আগের সেই সকালগুলোর মতো নয়।
কারণ এই সকালে রিফাত আর সেই হারানো ছেলেটা নয়।
সে এখন একজন মানুষ, যে শিখেছে হারানোর মধ্যেও বাঁচতে হয়, আর ভাঙার মধ্যেও নতুন কিছু গড়ে তুলতে হয়।
পাঁচ বছর কেটে গেছে।
এই পাঁচ বছরে অনেক কিছু বদলেছে।
পুরোনো ভাড়া বাড়িটা আর নেই।
সেই গলিটাও আগের মতো নেই।
কিন্তু কিছু জিনিস বদলায়নি—
মায়ের শেষ চিঠির শব্দ।
বাবার হাসির ছবি।
আর চারটি নিথর স্মৃতি, যেগুলো প্রতিদিন তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
রিফাত এখন আর সেই ছোট দোকানের কর্মচারী নয়।
সে কাজ করে একটি ছোট শিক্ষা-কেন্দ্র চালায়।
নাম— "শেষ ঘরের আলো পাঠশালা"
একটি টিনের চালের ঘর।
এক পাশে সাদা বোর্ড।
কয়েকটা পুরোনো বেঞ্চ।
আর সবচেয়ে বড় সম্পদ—অসহায়, পথশিশুদের চোখে শেখার স্বপ্ন।
প্রতিদিন বিকেলে এখানে ক্লাস শুরু হয়।
রিফাত নিজেই পড়ায়।
কখনও অঙ্ক, কখনও বাংলা, কখনও জীবনের গল্প।
সে বলে—
— "শিক্ষা শুধু বই নয়, এটা বাঁচার শক্তি।"
শিশুরা হাসে।
কেউ কেউ প্রথমবার নিজের নাম লিখতে শেখে।
কেউ প্রথমবার স্বপ্ন দেখতে শেখে।
আর রিফাত প্রতিদিন তাদের মুখে সেই ছোট্ট আলোটা দেখে বেঁচে থাকে।
এই উদ্যোগটা একদিন হঠাৎ শুরু হয়নি।
এটা শুরু হয়েছিল একটি ভাঙা ঘর থেকে।
একটি ডায়েরি থেকে।
একটি মায়ের লেখা চিঠি থেকে—
"তোমরা মানুষ হইও..."
এই একটি বাক্যই তার জীবনের দিক বদলে দিয়েছিল।
শহরের এক প্রান্তে সে মায়ের নামে একটি বৃত্তি চালু করেছে—
"শাহানা বেগম স্মৃতি বৃত্তি"
প্রতি বছর দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রথমবার যখন একটি মেয়ে সেই বৃত্তি পায়, সে এসে রিফাতের হাত ধরেছিল।
বলেছিল—
— "আপনার মা না থাকলেও, উনি আমাদের মতো অনেকের মা হয়ে গেছেন।"
সেদিন রিফাত অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেনি।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
রিফাতের জীবন এখন শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেও এক গভীর শূন্যতা আছে।
কিছু শূন্যতা কখনও পূর্ণ হয় না।
সে এখনও মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে।
মনে হয়, রান্নাঘর থেকে মা ডাকছেন—
— "রিফাত, পানি দে তো।"
কখনও মনে হয়, মুনা দৌড়ে এসে বলছে—
— "ভাইয়া, চকলেট এনেছ?"
কখনও মনে হয়, রিমি খাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে—
— "এই অঙ্কটা বুঝিয়ে দে।"
কখনও নীলা চুপচাপ বই খুলে বসে আছে।
এইসব অনুভূতি তাকে আজও ছাড়ে না।
কিন্তু এখন সে জানে—এই অনুভূতিই তার শক্তি।
এক বিকেলে শিক্ষা-কেন্দ্রে ক্লাস শেষ হলো।
শিশুরা দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
কেউ কেউ হাত নাড়ল।
কেউ বলল—
— "কাল আসব, ভাইয়া!"
রিফাত হেসে মাথা নাড়ল।
ঘরটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল।
সে একা রইল।
চুপচাপ।
বোর্ডে লেখা আজকের পাঠ—
"মানুষ হওয়া মানে ভালোবাসতে শেখা।"
সেই সন্ধ্যায় সে ফিরে গেল পুরোনো বাড়ির জায়গায়।
এখন সেখানে শুধু খালি জমি।
ভাঙা দেয়ালের কিছু অংশ এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
টিনের ছাদ নেই।
দরজা নেই।
শুধু স্মৃতি।
রিফাত ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
পায়ের নিচে শুকনো মাটি।
হাওয়ায় ধুলো।
সে দাঁড়াল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একদিন পুরো পরিবার ছিল।
চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ল—
সকালের হাসি।
মায়ের ডাকা।
বাবার কথা।
বোনদের ঝগড়া।
মুনার দৌড়।
সবকিছু।
সে ধীরে ধীরে বলল—
— "তোমরা নেই..."
কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।
কিছুক্ষণ থামল।
তারপর আবার বলল—
— "কিন্তু তোমাদের স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে।"
বাতাস নরমভাবে তার চারপাশে ঘুরে গেল।
মনে হলো, কেউ যেন শুনছে।
কেউ যেন দূর থেকে হাসছে।
রিফাত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
মাটির দিকে হাত রাখল।
আস্তে বলল—
— "মা... আমি কথা রেখেছি।"
চোখে জল এল।
কিন্তু সেই জল আর ভাঙার নয়।
এটা পূরণের।
এটা শক্তির।
সন্ধ্যা নামছে।
আকাশে কমলা আলো।
দূরে পাখির দল উড়ে যাচ্ছে।
রিফাত উঠে দাঁড়াল।
একবার চারপাশে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল।
পেছনে রয়ে গেল ফাঁকা ঘর।
আর সামনে রয়ে গেল নতুন পৃথিবী।
সমাপ্ত ।।