ঢাকা, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫৫:০৪ PM

হত্যা, ধর্ষণ,মাদক ও চাঁদাবাজি, উদ্বিগ্ন মানুষ

মান্নান মারুফ
28-06-2026 10:39:55 AM
হত্যা, ধর্ষণ,মাদক ও চাঁদাবাজি, উদ্বিগ্ন মানুষ

দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই এবং ব্যক্তি ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড জনমনে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। কুমিল্লায় একই ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার ঘটনা, টঙ্গী এলাকায় একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং বুড়িগঙ্গা নদী থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, অপরাধ দমনে আরও কার্যকর উদ্যোগ, দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, মাদকসংক্রান্ত সহিংসতা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অপরাধের ধরন ও বিস্তার আগের তুলনায় আরও জটিল ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বলছেন, এসব অপরাধ দমনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি অনেক এলাকায় একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি অংশ অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। অনেকেই নিরাপত্তার অভাবে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না।

অন্যদিকে মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সচেতন মহলের মতে, তরুণদের একটি অংশ মাদকের ভয়াবহ আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পরিবার ও সমাজে মারাত্মকভাবে পড়ছে। কোথাও কোথাও মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যা নতুন করে সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা, পাল্টা গণপিটুনি এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

এদিকে ছিনতাই, ডাকাতি ও পথচারীদের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে বলে অভিযোগ করছেন নগর ও গ্রামের বাসিন্দারা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নারী ও শিশুরা একা চলাচল করতে ভয় পাচ্ছেন। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তঃদলীয় সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে অপরাধের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে বলে তারা মনে করেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত সংঘর্ষ, পারিবারিক কলহ এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিও নষ্ট হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছুটা মানসিক চাপ ও দ্বিধা কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্য এখন আগের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সংকোচ বোধ করছেন। দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন ধরনের চাপ, সমালোচনার আশঙ্কা এবং চাকরি-সংক্রান্ত উদ্বেগও তাদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত অভিযান, টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাহিনী কাজ করছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক রহমতউল্লাহ বলেন, "পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও কার্যকর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক সহায়তা এবং দায়িত্ব পালনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অপরাধ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত কমিউনিটি পুলিশিং, দ্রুত বিচার কার্যক্রম এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা—অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ ভয়মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবেন এবং অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবেন না।