পর্ব-১
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে। পূর্ব আকাশে লালচে আভা উঠেছে মাত্র। ছোট্ট ভাড়া বাসাটার টিনের চালের ওপর রাতের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো টুপটাপ করে পড়ছে। দূরে মসজিদ থেকে ফজরের আজানের শেষ ধ্বনি ভেসে আসছে। ডাকাতিয়া নদীর দিক থেকে হালকা বাতাস এসে জানালার পর্দাটা দুলিয়ে দিচ্ছে।
এই ছোট্ট ঘরটাই ছিল রিফাতদের পৃথিবী।
দুটি ছোট কক্ষ, একটি সরু বারান্দা আর রান্নাঘর বলতে টিন দিয়ে ঘেরা একটি কোণ। অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। ঘরের দেয়ালে ঝুলছিল পুরোনো একটি পারিবারিক ছবি। ছবিতে বাবা হাসছেন, পাশে মা, সামনে চার ভাইবোন। ছবিটা পাঁচ বছর আগের। তারপর অনেক কিছু বদলে গেছে।
বাবা নেই।
বাবার মৃত্যুর পর যেন সংসারের হাসিটাও অর্ধেক হারিয়ে গিয়েছিল। তবু শাহানা বেগম হার মানেননি। ভোরে উঠে মানুষের বাসায় সেলাইয়ের কাজ করতেন, দুপুরে অন্যের কাপড় কেটে দিতেন, রাতে বসে পুরোনো জামা মেরামত করতেন। সন্তানদের সামনে কখনও নিজের কষ্ট দেখাতেন না।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
রান্নাঘর থেকে ডালের ফোড়নের গন্ধ ভেসে আসছিল।
রিফাত ঘুমচোখে উঠে বসতেই মা হাসলেন।
— "ঘুম ভাঙছে বাবা?"
— "হ্যাঁ মা।"
— "মুখ ধুয়ে আয়। গরম ভাত দিচ্ছি।"
রিফাত মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। কতদিন হলো, মাকে নতুন একটা শাড়ি কিনে দিতে পারেনি। প্রতিবারই ভাবত, এই মাসে বেতন পেলে কিনবে। কিন্তু মাস শেষ হতে না হতেই সংসারের কোনো না কোনো প্রয়োজন এসে দাঁড়াত।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে বড় বোন রিমি চুল শুকাচ্ছিল।
— "এই রিফাত, তুই আবার কলেজে দেরি করবি।"
রিফাত হেসে বলল,
— "আগে দোকানে যাব, তারপর কলেজ।"
মেজো বোন নীলা বই হাতে বসে ছিল।
— "আমার গণিতটা দেখে দিবি?"
— "রাতে দেখে দেব।"
— "রাতে তো আবার ক্লান্ত থাকিস।"
— "আজ দেখব। কথা দিলাম।"
ছোট্ট মেয়ে মুনা তখনও আধোঘুমে।
চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
— "ভাইয়া, ফেরার সময় আমার জন্য চকলেট আনবি?"
রিফাত মজা করে বলল,
— "টাকা থাকলে দুইটা আনব।"
মুনা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "সব সময় একই কথা।"
ঘরের ভেতর হেসে উঠল সবাই।
এই হাসির শব্দগুলোই ছিল সেই পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
মা থালা সাজিয়ে বললেন,
— "এসো, সবাই খেয়ে নাও।"
একটা প্লেটে ডাল, আলুভর্তা আর শুকনো মরিচ।
অভাবের সংসারে এই খাবারই যেন রাজভোজ।
খেতে খেতে মা বললেন,
— "রিফাত, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস।"
— "কেন?"
— "তোর পছন্দের মুসুর ডাল রান্না করব।"
— "ডাল তো রোজই খাই।"
মা হেসে বললেন,
— "আজ একটু অন্যভাবে রান্না করব।"
রিফাত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটা কত অল্পে সুখ খুঁজে নিতে জানে!
খাওয়া শেষ করে সে পুরোনো ব্যাগটা কাঁধে তুলল।
মা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
চোখে ছিল অদ্ভুত এক মমতা।
— "সাবধানে যাস বাবা।"
— "আচ্ছা।"
— "দুপুরে ফিরে আসিস।"
— "চেষ্টা করব।"
— "চেষ্টা না। আসবি।"
রিফাত হেসে বলল,
— "আচ্ছা মা, ফিরব।"
মা আবার বললেন,
— "শোন..."
— "কি?"
— "নিজের খেয়াল রাখিস।"
রিফাত বিরক্তির ভান করে বলল,
— "তুমি প্রতিদিন একই কথা বলো।"
মা শুধু হেসে দিলেন।
সে জানত না, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তার শেষ কথা।
বাইরে রোদ উঠতে শুরু করেছে।
বাজারের দোকানগুলো খুলছে।
রিকশার ঘণ্টা, মানুষের হাঁকডাক, সব মিলিয়ে ছোট্ট শহরটা জেগে উঠেছে।
রিফাত যে দোকানে কাজ করে, সেখানে পৌঁছাতে আধাঘণ্টা লাগে।
পথে যেতে যেতে তার মনে পড়ল বাবার কথা।
এই রাস্তা দিয়েই একদিন বাবা হাঁটতেন।
কাঁধে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে।
সারাদিন ফেরি করে সন্ধ্যায় ফিরতেন।
মুখে ক্লান্তি থাকত, কিন্তু হাতে থাকত সন্তানের জন্য বিস্কুট।
তারপর এক বর্ষার দুপুরে বিদ্যুতের খোলা তার ছুঁয়ে সব শেষ হয়ে গেল।
সেদিন থেকেই রিফাত বড় হয়ে গেল।
কলেজের বইয়ের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বও তুলে নিতে হলো।
মাসে আট হাজার টাকা বেতন।
এই টাকাতেই চলত পাঁচজন মানুষের স্বপ্ন।
দোকানের মালিক রহমান চাচা বললেন,
— "আজ একটু বেশি কাজ আছে।"
— "ঠিক আছে চাচা।"
রিফাত কাজে লেগে গেল।
গ্রাহকদের পণ্য দেখানো, হিসাব লেখা, মাল গোছানো।
এর মাঝেও কয়েকবার তার মনে পড়ল বাড়ির কথা।
মুনার চকলেট।
নীলার অঙ্ক।
রিমির কলেজের ফি।
মায়ের পুরোনো শাড়ি।
সে মনে মনে হিসাব করতে লাগল।
আগামী মাসে যদি কিছু ওভারটাইম করতে পারে...
তাহলে হয়তো একটা নতুন শাড়ি কেনা যাবে।
এদিকে বাড়িতে স্বাভাবিক সকাল চলছিল।
রিমি ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল।
নীলা পড়ার টেবিলে বসে পরীক্ষা প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
মুনা পুতুল নিয়ে খেলছিল।
মা রান্নাঘরে ডাল বসিয়েছেন।
চুলার আগুনে হাঁড়ির ঢাকনা কাঁপছে।
মা মনে মনে ভাবছিলেন—
"ছেলেটা অনেক কষ্ট করে। আজ ওর পছন্দের রান্না করব।"
তিনি জানতেন না, ভাগ্য তার জন্য অন্য এক নির্মম গল্প লিখে রেখেছে।
দুপুরের দিকে দোকানে ভিড় একটু কমল।
রিফাত মোবাইল বের করে মাকে ফোন করতে গেল।
ভাবল জিজ্ঞেস করবে, বাজার থেকে কিছু আনতে হবে কি না।
কিন্তু ফোন ধরল না কেউ।
সে ভাবল, মা হয়তো রান্নাঘরে আছেন।
আরেকটু পরে করবে।
দশ মিনিট পর আবার ফোন করল।
এবারও কেউ ধরল না।
অকারণে বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি জমতে লাগল।
ঠিক তখনই মোবাইল কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
"রবিন ভাই"
পাশের বাড়ির প্রতিবেশী।
রিফাত ফোন ধরতেই ওপাশে কাঁপা কণ্ঠ।
— "রিফাত..."
— "জি ভাই?"
কিছুক্ষণ কোনো কথা নেই।
শুধু ভারী শ্বাসের শব্দ।
রিফাতের বুক ধকধক করতে লাগল।
— "কী হয়েছে?"
ওপাশ থেকে ভাঙা গলায় ভেসে এল—
— "তুই... তুই এখনই বাড়ি আয়..."
— "কেন? মা ঠিক আছে তো?"
আবার নীরবতা।
তারপর যেন কান্না চেপে রাখা একটি কণ্ঠ—
— "দ্রুত আয়..."
লাইন কেটে গেল।
রিফাত কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হাতে ধরা মোবাইলটা কাঁপছে।
তার মনে হলো, পৃথিবীর সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
কিছু একটা ঘটেছে।
কিন্তু কী?
সে জানে না।
সে শুধু ছুটতে শুরু করল।
দোকানের মালিক ডাকলেন—
— "কোথায় যাচ্ছিস?"
রিফাত কোনো উত্তর দিল না।
তার পা শুধু বাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে।
সে জানে না, কয়েক মিনিট পর যে বাড়ির সামনে সে দাঁড়াবে, সেই বাড়িতে আর কোনোদিন মায়ের ডাক শোনা যাবে না।
সে জানে না, বারান্দায় আর দাঁড়িয়ে থাকবে না তিনটি পরিচিত মুখ।
সে জানে না, সকালের সেই হাসিগুলো ইতোমধ্যেই সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে।
তখনও কেউই জানে না—একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প মাত্র শুরু হলো।
চলবে...........