ঢাকা, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৩২:৫০ AM

কাজী হাসানের ১৬০০ কোটি টাকা পাচার যুক্তরাষ্ট্রে!

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
27-06-2026 01:29:34 PM
কাজী হাসানের  ১৬০০ কোটি টাকা পাচার যুক্তরাষ্ট্রে!

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সিডিএর বিভিন্ন নথি, মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং আদালতের কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সিডিএতে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কল্পলোক আবাসিক এলাকা (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্তের উদ্যোগ নিলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

২০০৮ সালে অক্সিজেন-কুয়াইশ বুড়িশ্চর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, দুটি ক্রস কালভার্ট নির্মাণে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩ লাখ টাকা জমা দিয়ে ট্রুথ কমিশনের কাছে আবেদন করেন। তবে পরবর্তীতে ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করায় ওই প্রক্রিয়ার আইনি কার্যকারিতা বাতিল হয়ে যায়। এদিকে, ২০১২ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের মধ্যেই ২০১১ সালে তাকে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে ৮৫৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি একাধিকবার সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালে নির্মাণাধীন আউটার রিং রোডের একটি অংশ ধসে পড়ার ঘটনায় প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এছাড়া প্রকল্পে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযানে প্রকল্পে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্পেও ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে কাজী হাসান প্রভাব খাটিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়েছে এবং নিউইয়র্কে তার পরিবারের নামে সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত বা আদালতের রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকলেও তিনি বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব), একাধিক মেগা প্রকল্পের পরিচালক, নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্যসচিব, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন কমিটির চেয়ারম্যান এবং ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যানসহ মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে একই ব্যক্তির হাতে নকশা অনুমোদন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির মতো সাংঘর্ষিক দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ।

এদিকে, প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে উচ্চ আদালতে দাখিল করা রিটে ভুয়া নথি সংযুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২৫ সালের দুটি পৃথক আবেদনপত্রে একই কর্মকাল উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট রিসিভ কপির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিডিএ কর্তৃপক্ষ।

সিডিএর চাকরি প্রবিধানমালা অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী হতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সমালোচকদের দাবি, কাজী হাসানের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ায় তিনি ওই যোগ্যতা পূরণ করেন না। এছাড়া গত ১৬ বছরে তিনি নিজের পদ ও দায়িত্ব বহাল রাখতে ৪৪টি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গত বছর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সিডিএর ২০ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ১৩টি মেগা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, পরবর্তীতে ওই তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয়নি।

এ বিষয়ে কাজী হাসান বিন শামসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সিডিএর একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহল।