ঢাকা, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১১:১৪:২৮ AM

রেলওয়েতে লুৎফার ২৩ বছরের রাজত্ব

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
01-09-2026 07:09:06 PM
রেলওয়েতে লুৎফার ২৩ বছরের রাজত্ব

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী লুৎফা বেগমকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ২৩ বছর একই দপ্তরে কর্মরত থাকা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, সহকর্মীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ে যোগ দেন লুৎফা বেগম। এরপর ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই যুগ ধরে একই কর্মস্থলে কোনো বদলি ছাড়াই অবস্থান করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁর কয়েকজন সহকর্মী। তাঁদের মতে, বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক প্রয়োজনে নিয়মিত বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও লুৎফা বেগমের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুযোগে কোনো কোনো কর্মচারী প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন। প্রশাসনের নীরবতা থাকলে তাঁরা রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ পান। এতে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লুৎফা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার সুযোগে তিনি সেখানে একটি নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেছেন। বদলি, নিয়োগ, পেনশন, সাময়িক বরখাস্ত-সংক্রান্ত ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং টিএলআর নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এ ছাড়া সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে তাঁকে অতীতে দুবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরে ওই শোকজ বাতিল করা হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব কমেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সহায়তায় তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া ও এর সঙ্গে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

লুৎফা বেগম ও তাঁর পরিবারের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বল্প বেতনের চাকরি করলেও চট্টগ্রামের হালিশহরের কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট, নালাপাড়াসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি, ঢাকায় বাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তাঁর কার্যালয়ে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপটি। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪। বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০০১ সালে নিবন্ধিত গাড়িটির মালিক সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (রমনা সড়ক ভবন)।

সওজের সহকারী বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে কর্মরত লুৎফা বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, গাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ এবং অফিসিয়াল কাজ শেষে সময় পেলে তিনি স্ত্রীকে আনা-নেওয়ার জন্য সেটি ব্যবহার করতে দেন।

তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন গণমাধ্যমকে জানান, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের কর্মকর্তারা সাধারণত পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত গাড়ি সাধারণত দপ্তরপ্রধানদের জন্য বরাদ্দ থাকে। ফলে এক দপ্তরের সরকারি গাড়ি অন্য দপ্তরের কর্মচারীর ব্যক্তিগত যাতায়াতে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লুৎফা বেগমের মুঠোফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি বিস্তারিত কোনো জবাব দেননি। তিনি ব্যঙ্গাত্মক ইমোজি দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এর আগে অপর একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, কে এসব তথ্য পাঠিয়েছে তা তিনি জানেন। তাঁর দাবি, একটি পক্ষ পদোন্নতির আশায় তাঁকে সরানোর ষড়যন্ত্র করছে। তিনি আরও বলেন, প্রশাসন তাঁকে ভালোভাবে চেনে এবং আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোনো অশুভ শক্তি তাঁকে সরাতে পারবে না।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, দীর্ঘ ২৩ বছর একই দপ্তরে অবস্থান, আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ—সব বিষয়ই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।