ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৪:০৭:২১ AM

নিয়োগ-বদলিতে শফিকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
24-08-2026 12:02:07 PM
নিয়োগ-বদলিতে শফিকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রশাসনিক কার্যক্রমে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও বিধিমালা অনুসরণের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এলজিইডির প্রশাসন শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শফিকুর রহমানের নাম। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে আসছেন।

তবে অভিযোগের বিষয়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

এলজিইডির সাম্প্রতিক পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো অর্থ লেনদেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১৯৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার সময় জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখানো হতো।

শুধু সহকারী প্রকৌশলী পর্যায়ে নয়, সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও প্রায় ১৩৫ কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সার্ভেয়ার পর্যায়ের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতার ক্রম উপেক্ষা করে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে নেওয়ার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ করা হতো।

বদলি-পদায়নেও ‘রেটকার্ড’

বদলি ও পদায়নকে ঘিরেও এলজিইডির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ বা কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, সাভারে একটি কাঙ্ক্ষিত পদে পদায়নের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জাজিরায় সহকারী প্রকৌশলীর একটি পদে বদলির জন্য ১০ লাখ টাকা নির্ধারণের অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল সদর থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলায় একজন প্রকৌশলীর পদায়নের ক্ষেত্রেও ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

নিয়োগে সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সময়ের ‘সমঝোতা’

অভিযোগের পরিধি শুধু বর্তমান প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের দায়িত্বকালেও নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একটি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় কোটি টাকার একটি গোপন সমঝোতা হয়েছিল। ‘আব্দুল ওহাব’ নামে এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কথিত অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই সমঝোতা অনুযায়ী ১ কোটি টাকা তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর জন্য, ৩০ লাখ টাকা শফিকুর রহমানের জন্য এবং বাকি অর্থ সংশ্লিষ্ট অন্যদের মধ্যে বণ্টনের পরিকল্পনা ছিল।

১২ প্রকৌশলীর পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন

এলজিইডির ভেতরে বিধিমালা উপেক্ষা করে ১২ জন প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল কবির এবং কথিত ‘ওহাব সিন্ডিকেটের’ প্রভাবে ওই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদোন্নতির ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির প্রত্যাশায় থাকা অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

৩০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ‘সোহেল’ নামে একজন ব্যক্তি প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং ‘মান্নান’ নামে আরেকজন প্রায় ৫০ লাখ টাকা অর্জন করেছেন। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, উৎস ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুরোনো তদন্তেও আলোচনায় নাম

এলজিইডির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্ত চলাকালে শফিকুর রহমানের নাম আলোচনায় আসে।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক আজিজুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল এলজিইডির বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান ও আলী আকতার হোসেনসহ একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় শফিকুল ইসলাম ও শফিকুর রহমানকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে আসে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।

৩৬ অফিসে তল্লাশির তথ্য

অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়ে এলজিইডির পুরোনো নথিপত্র তলব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে সংস্থাটিতে সংঘটিত নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে এলজিইডির ৩৬টি অফিসে একযোগে তল্লাশি চালানোর কথাও জানা গেছে। তবে এসব অনুসন্ধান ও তৎপরতার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

জবাবদিহির প্রশ্ন

পদোন্নতি থেকে বদলি, পদায়ন থেকে নিয়োগ—এলজিইডির প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বিষয় নয়; বরং সরকারি নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হলে স্পষ্ট হতে পারে, এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামোয় সত্যিই কোনো সংঘবদ্ধ অনিয়মের চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না এবং থাকলে এর সঙ্গে কারা জড়িত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।