দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ এবং এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম, জাল সনদ ও ভুয়া নিবন্ধন ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, যথাযথ যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় কিছু শিক্ষক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন। পরে তাঁদের কেউ কেউ এমপিওভুক্তও হয়েছেন। এসব অভিযোগের কারণে প্রকৃত যোগ্যতা ও বৈধ নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও অনেক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা, সনদের সত্যতা এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) নিবন্ধন যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যোগ্যতার ঘাটতি থাকা ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির একজন অধ্যক্ষের শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর শিক্ষাজীবনে কোনো পর্যায়েই প্রথম বিভাগ বা সমমানের ফলাফল নেই এবং তিনি পাস কোর্সে পড়াশোনা করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, আত্মীয়তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁকে ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পরবর্তীতে তিনি এমপিওভুক্ত হন।
পরবর্তীতে ওই ব্যক্তিকে একই স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে সনদ, নিবন্ধন ও নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করার দাবি উঠেছে।
শিক্ষাবিদ ও চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি অংশের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষক শুধু একটি চাকরির পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন; তাঁর ওপর একটি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব থাকে। ফলে জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে কেউ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলে তা শুধু চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে অন্যায় নয়, শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি। তাঁদের দাবি, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী হলেও তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিবন্ধন এবং নিয়োগের বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
এ অবস্থায় সারাদেশের এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের একাডেমিক সনদ, শিক্ষক নিবন্ধন সনদ, নিয়োগপত্র এবং এমপিওভুক্তির নথি পুনরায় যাচাই করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে যেসব নিয়োগে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ হয়নি, সেসব নিয়োগের বিষয়ে পৃথক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।
তাঁদের মতে, যাচাই-বাছাইয়ে যদি কোনো শিক্ষকের সনদ জাল, নিবন্ধন ভুয়া কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়া আইনবহির্ভূত প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে জালিয়াতির সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্য বা অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে।
অন্যদিকে প্রকৃত ও বৈধ নিবন্ধনধারী চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, যোগ্য প্রার্থীরা যদি নিয়োগ না পান এবং অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন চাকরিতে বহাল থাকেন, তাহলে শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।
তবে সারাদেশে ‘লক্ষাধিক’ বা নির্দিষ্ট কোনো শতাংশ শিক্ষক জাল সনদধারী—এমন দাবি যাচাইযোগ্য সরকারি তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা উচিত নয়। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে এনটিআরসিএ নিবন্ধন, একাডেমিক সনদ, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, মেধাক্রম, নিয়োগপত্র এবং এমপিওভুক্তির তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। যাঁরা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য ও বৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের সুরক্ষা দিতে হবে; আর জালিয়াতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা গেলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের অনিয়ম অনেকাংশে কমবে। একই সঙ্গে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের পথ সুগম হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।