ঢাকা, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০২:৪৮:০৩ AM

উপন্যাস: মুক্তিচাই

মান্নান মারুফ
02-04-2026 09:16:55 PM
উপন্যাস: মুক্তিচাই

শেষ পর্ব

কারাগারের সেই বিশাল লোহার দরজাটা আজও একই রকম—ভারী, শীতল, নির্লিপ্ত। কিন্তু আজকের সকালটা আলাদা। ভোরের আলো ধীরে ধীরে দেয়ালের উপর গড়িয়ে পড়ছে, যেন দীর্ঘ অন্ধকারের বুক চিরে আলো প্রবেশের এক নিঃশব্দ ঘোষণা।

আমি শেষবারের মতো এসেছি। অন্তত আমার কাছে এটাই শেষ দেখা—কিন্তু কোথাও যেন মনে হচ্ছে, এটি শেষ নয়, বরং একটি নতুন শুরুর দ্বারপ্রান্ত।

ভেতরে ঢুকতেই সেই পরিচিত গন্ধ, সেই নিস্তব্ধতা—কিন্তু আজ যেন সবকিছু একটু নরম, একটু কম কঠিন মনে হচ্ছে।

শওকত মাহমুদ কোণের সেই জায়গাটাতেই বসে আছেন, যেখানে প্রথম দিন তাকে দেখেছিলাম। তবে আজকের তার চেহারায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন। ভাঙন আছে, ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার ভেতরে যেন এক ধরনের প্রশান্তি জন্ম নিয়েছে।

আমি এগিয়ে যেতেই তিনি তাকালেন।

“তুমি এসেছো,”—তিনি মৃদু হেসে বললেন।

আমি বসে পড়লাম তার সামনে।
“হ্যাঁ… মনে হলো, একবার দেখা দরকার।”

তিনি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
“দেখা সবসময় দরকার হয় না… কিছু কিছু অনুভবও করতে হয়।”

আমি চুপ করে থাকলাম।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি নিজেই বললেন,
“জানো, এই জায়গাটা আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—মানুষ আসলে বাইরে যতটা শক্ত, ভেতরে ততটা না।”

তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো তীব্রতা—শুধু এক ধরনের গভীর উপলব্ধি।

ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন সেই দুই সাংবাদিক, যাদের সাথে আগের দিন দেখা হয়েছিল।

তাদের চোখে আজ অন্যরকম এক আলো—ম্লান হলেও নিভে যায়নি।

একজন ধীরে বললেন,
“শুনেছি, আমাদের মামলার শুনানি আবার শুরু হতে পারে।”

কথাটা খুব নিশ্চিত না, তবুও যেন বাতাসে হালকা এক আশার সুর ছড়িয়ে পড়ল।

শওকত মাহমুদ তাকালেন তাদের দিকে।

“দেখেছো? আশা কখনো মরে না,”—তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।

আমি অনুভব করলাম—এই মানুষগুলো শুধু বন্দি নয়, তারা অপেক্ষমাণ।

অপেক্ষা—একটা দিনের, একটা আলোর, একটা মুক্তির।

আমি শওকত মাহমুদের দিকে তাকালাম।

“আপনি কি বিশ্বাস করেন, সব ঠিক হয়ে যাবে?”

তিনি একটু হাসলেন।

“সব ঠিক হয়ে যায় না… কিন্তু মানুষ ঠিক হয়ে যায়।”

কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল।

তিনি আবার বললেন,
“আমরা হয়তো আগের জায়গায় ফিরতে পারব না, কিন্তু নতুন একটা জায়গা খুঁজে নিতে পারব।”

তার চোখে আমি এক ধরনের দৃঢ়তা দেখলাম—যা কোনো দেয়াল ভাঙতে পারে না, কিন্তু মানুষকে টিকিয়ে রাখে।

কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।

“ওই আকাশটা দেখো…”

আমি তাকালাম।

এক টুকরো নীল আকাশ—শিকের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়।

“ওটা সবসময় একই থাকে,”—তিনি বললেন—
“আমরা বদলাই, আমাদের অবস্থা বদলায়… কিন্তু আকাশ বদলায় না।”

তার কথাগুলো যেন আমার ভেতরে গেঁথে যাচ্ছিল।

“তুমি লিখছো তো?”—তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন।

আমি মাথা নেড়ে বললাম,
“হ্যাঁ, লিখছি।”

তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“তাহলে একটা কথা মনে রেখো—
আমাদের নায়ক বানানোর দরকার নেই।
আমরা শুধু মানুষ… যারা বাঁচতে চেয়েছিলাম, সত্য বলতে চেয়েছিলাম।”

তার কথায় কোনো অহংকার নেই—
শুধু এক ধরনের সরল স্বীকারোক্তি।

পাশ থেকে একজন সাংবাদিক বললেন,
“আমাদের নাম কেউ মনে রাখুক বা না রাখুক… আমাদের গল্প যেন হারিয়ে না যায়।”

আমি তাদের দিকে তাকালাম।

এই মানুষগুলো হয়তো ইতিহাসের পাতায় জায়গা পাবে না,
কিন্তু তাদের যন্ত্রণা, তাদের আশা—এসব অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো নয়।

কারাগারের বাইরে থেকে হঠাৎ একটা শব্দ এলো—
সময়ের সংকেত।

আমাকে উঠতে হলো।

আমি ধীরে ধীরে দাঁড়ালাম।

“আমি আবার আসব…”—বলতে গিয়েও থেমে গেলাম।

কারণ জানি, হয়তো আর আসা হবে না।

শওকত মাহমুদ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আসা না আসা বড় কথা না… মনে রাখা বড় কথা।”

আমি কিছু বলতে পারলাম না।

শুধু মাথা নেড়ে বের হয়ে এলাম।

লোহার সেই দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল—একটা ভারী শব্দে।

কিন্তু আজ সেই শব্দটা আর ভয় ধরালো না।

কারণ আমি জানি, এই দেয়ালের ভেতরে যে মানুষগুলো আছে, তারা ভেঙে পড়েনি।

তারা অপেক্ষা করছে।

বাইরে এসে আমি আকাশের দিকে তাকালাম।

একই আকাশ—যেটা তিনি দেখছিলেন ভেতর থেকে।

হঠাৎ মনে হলো, মুক্তি আসলে জায়গার না—মুক্তি একটা অনুভূতি।

কেউ দেয়ালের ভেতরে থেকেও মুক্ত হতে পারে,
আবার কেউ বাইরে থেকেও বন্দি থাকতে পারে।

দিন কেটে যায়।

সময়ের সাথে সাথে খবর আসে, আলোচনা হয়, আবার থেমে যায়।

কিন্তু সেই কারাগারের ভেতরের গল্পগুলো আমার ভেতরে থেকে যায়।

আমি কলম তুলে নিই।

লিখতে শুরু করি—

কিছু মানুষের গল্প,
যারা অপরাধী নয়, তবুও বন্দি;
যারা ভেঙে পড়েনি, তবুও ক্লান্ত;
যারা হারিয়ে যায়নি, তবুও অদৃশ্য।

লিখতে লিখতে আমি বুঝতে পারি—
এই গল্প শেষ করার মতো না।

কারণ মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয় না।

শেষ লাইনে আমি লিখি—

“তারা মুক্তি চেয়েছিল…
আর সেই চাওয়াটাই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল।”

কলম থেমে যায়।

কিন্তু গল্প থামে না।

কারণ কোথাও না কোথাও,
আরও কিছু মানুষ আজও একই শব্দ উচ্চারণ করছে—

মুক্তি চাই।