ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৪:০৭:১৪ AM

পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতি:২২ টির লেনদেন বন্ধ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
17-08-2026 04:14:13 PM
পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতি:২২ টির লেনদেন বন্ধ

অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদারকির ঘাটতিতে দেশের পুঁজিবাজারে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) ও প্রকৃত সম্পদে (নেটওয়ার্থ) ঘাটতিসহ নানা অনিয়মের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২২টি ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে এসব ব্রোকারেজ হাউসের হাজারো বিনিয়োগকারী চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তিতে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থ ও শেয়ার ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে তাদের মধ্যে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমে যাবে।

জানা গেছে, কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে সিসিএতে থাকা বিনিয়োগকারীদের অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাংকো সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিউর সিকিউরিটিজের অনিয়ম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এসব প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অর্থ ও শেয়ারের ঘাটতি শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া এনআরবিসি সিকিউরিটিজে সম্প্রতি ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত করেছে ডিএসই। তবে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন এখনো চালু রয়েছে।

নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে লেনদেন স্থগিত থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, পিএফআই সিকিউরিটিজ, সালতা ক্যাপিটাল, অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডন সিকিউরিটিজ, ইনডিকেট সিকিউরিটিজ, আল ফয়সাল সিকিউরিটিজ, শাহ মুহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি, ট্রেডক্যাপ স্টক ব্রোকারেজ, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, কবির সিকিউরিটিজ, মনার্ক হোল্ডিংস, স্নিগ্ধা ইকুইটিজ, সোনালি সিকিউরিটিজ, ট্রেড এক্স সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ ও সামিন সিকিউরিটিজ।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৪ জুন প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে আত্মগোপনে যাওয়ার পর ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে অনুসন্ধান চালিয়ে ১২৬ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়া যায়। ডিএসইর আইনি পদক্ষেপের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যরা গ্রেপ্তার হন। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।

২০২১ সালের ৭ জুন বাংকো সিকিউরিটিজে ১২৮ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয়। ওই বছরের ১৫ জুন প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন বন্ধ করে দেয় ডিএসই। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আব্দুল মুহিত ব্রিটিশ পাসপোর্টে দেশত্যাগের চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে তিনিও জামিনে মুক্তি পান।

এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তামহা সিকিউরিটিজে ১৪০ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের আগস্টে মশিউর সিকিউরিটিজে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয়। এসব অনিয়মের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন স্থগিত করা হয়। ডিএসই কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের পর বছর সিসিএ থেকে বিনিয়োগকারীদের জমাকৃত অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মশিউর সিকিউরিটিজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী জানান, বেতনের অর্থ দিয়ে তিনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি জানতে পারেন, তার ব্রোকারেজ হাউস বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। এরপর থেকে অর্থ ফেরতের জন্য যোগাযোগ করলেও এখনো টাকা ফেরত পাননি।

মশিউর সিকিউরিটিজের পরিচালক শেখ মোগল জান রহমান মৃদুল জানান, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কুয়াকাটায় থাকা তাদের একটি আবাসিক হোটেল এবং মাওনায় থাকা কয়েকটি সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। এসব সম্পদ বিক্রি করে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের জন্য চেক দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যেসব ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত কারণ বের করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করা সম্ভব। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দ করে তা বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, এ সংকটের দায় ডিএসইকেই নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ডিএসইকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে মেম্বারশিপ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নজির রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাৎকারী ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিশেষ অডিটর প্যানেল গঠন করে আগাম ঘোষণা ছাড়াই ব্রোকারেজ হাউস পরিদর্শনে পাঠাতে স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। প্রয়োজনে বিএসইসি নিজেও সরাসরি পরিদর্শন করবে। গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়লে কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের পাশাপাশি লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে যেসব বিনিয়োগকারীর অর্থ ও শেয়ার তছরুপ হয়েছে, সেগুলো বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের সম্পদ বিক্রি, মালিকদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিএসইসি।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু লেনদেন বন্ধ করে রাখলে সংকটের সমাধান হবে না। বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত অডিট, কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।