বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোর একটি বাসের মেরামত ব্যয়, যন্ত্রাংশের হিসাব ও ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। একই বাসকে কেন্দ্র করে মেরামতের দুটি প্রাক্কলনে বিপুল ব্যবধান, অকেজো ঘোষণার নথির সঙ্গে পরবর্তী মেরামত পরিকল্পনার বৈপরীত্য এবং ডিপো থেকে পুরোনো যন্ত্রাংশ খুলে ফেলার অভিযোগ পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, আলোচিত বাসটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৫৪৯৯। বাসটি ২০১১ সালে প্রস্তুত করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে এবং স্থানীয় বাজারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না পাওয়ার যুক্তিতে বাসটিকে অকেজো ঘোষণার সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে মেরামত প্রাক্কলনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১০ মার্চ স্মারক নম্বর ৩১২-এর মাধ্যমে বাসটির মেরামত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকা। প্রায় ২১ মাস পর, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর একই বাসের মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৭৫ টাকা, যা আগের প্রাক্কলনের তুলনায় ৮ গুণেরও বেশি।
এত পুরোনো একটি বাসের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মেরামত ব্যয় এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে কী ধরনের কারিগরি পরিবর্তন ঘটেছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষ করে মোটরযান অকেজো-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বাসটির ইঞ্জিন, এসি ও গিয়ারবক্স সম্পূর্ণ অকেজো বলে উল্লেখ থাকার পরও পরবর্তীতে সেটির জন্য ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকার মেরামত প্রাক্কলন তৈরি হওয়া বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বাসটি ডিপোর ওয়ার্কশপে থাকা অবস্থায় এর বিভিন্ন পুরোনো যন্ত্রাংশ খুলে ফেলা হয়েছে। এসব যন্ত্রাংশের বিষয়ে স্টোর রেজিস্টার, গ্রহণ-বিতরণ নথি কিংবা নিলাম-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজনের নামে অতিরিক্ত বা ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বাসটি ওয়ার্কশপে পাঠানোর আগের ইনভেন্টরি এবং ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের ইনভেন্টরি পাশাপাশি রেখে প্রতিটি যন্ত্রাংশের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি যন্ত্রাংশ ক্রয়ের কার্যাদেশ, সরবরাহকারীর চালান, বাজারদর, স্টোর রিসিভিং রিপোর্ট (এসআরআর), বিল-ভাউচার ও পেমেন্ট নথির ফরেনসিক অডিট করা দরকার। শ্রম ব্যয়ের ক্ষেত্রেও জব কার্ড, মজুরি রেজিস্টার ও পেমেন্ট ভাউচারের সঙ্গে বাস্তবে সম্পন্ন কাজের মিল যাচাই করা উচিত।
এ ছাড়া বিআরটিসির অকেজো ঘোষিত ৩৩টি গাড়ি ১৬ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির প্রক্রিয়ার সঙ্গে আলোচিত বাসটির কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ ও জনগণের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। এ জন্য কারিগরি বিশেষজ্ঞ, হিসাব ও অডিট বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৫ টাকা থেকে ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকায় মেরামত ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বাস্তব কারিগরি কারণ ছিল, নাকি এর সঙ্গে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম জড়িত।