ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে ইশরাক হোসেন একটি পরিচিত নাম। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনার প্রবণতা তাকে অনেকের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। রোববার ৫ জুলাই ২০২৬ এর একটি দীর্ঘ কর্মব্যস্ত দিন যেন সেই মানবিক দিকটিরই আরেকটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল তার মাঝে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার মন্ত্রনালয়ে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ এসেছেন চিকিৎসার সহায়তার আবেদন নিয়ে, কেউ আর্থিক সংকটের কথা জানাতে, কেউবা ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে। দাপ্তরিক কাজের ফাকেঁ ফাকেঁ প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন তিনি। কারও আবেদন ফিরিয়ে না দিয়ে, যথাসাধ্য সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন ইশরাক। কারও জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন, আবার কারও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করেছেন।
দিনজুড়ে একের পর এক মানুষের কথা শোনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা ছিল সত্যিই কঠিন একটি দায়িত্ব। সামনে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতির ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি মানুষের সেবাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেকেই মন্তব্য করেন।
যারা সেদিন তার কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষের অভিযোগ, কষ্ট ও প্রত্যাশার কথা শুনলেও তার আচরণে ছিল না বিরক্তির কোনো ছাপ। ধৈর্য, সংযম এবং আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি সবার কথা শুনেছেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, যেন তিনি একজন ক্লান্তিহীন কর্মী—যার মধ্যে রাগ, অধৈর্য কিংবা অবসাদের কোনো প্রকাশ নেই। বয়সে তুলনামূলক তরুণ হলেও তার আচরণে ছিল পরিপক্বতা ও স্থিরতা।
একটি ঘটনা সেদিন উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জুলাই আন্দোলনে আহত আল-আমিন নামে এক তরুণ তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। দুর্ঘটনায় বা সহিংসতায় তার একটি হাতের কবজিসহ বড় অংশ হারিয়ে গেছে। বিষয়টি জানার পর ইশরাক হোসেন তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন এবং আধুনিক কৃত্রিম হাত (প্রস্থেটিক) সংযোজনের সম্ভাবনা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করেন। তিনি নির্দেশ দেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অর্থের অভাব যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এই মানবিক উদ্যোগ উপস্থিত মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
একজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী বলেন, “পুরান ঢাকার মানুষ ইশরাক হোসেনকে পেয়ে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন। তিনি শুধু রাজনীতি করেন না, মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের কথা শোনা এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সহজ বিষয় নয়।”
ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পথচলাও বেশ আলোচিত। তিনি ঢাকার সাবেক মেয়র এবং বিএনপির প্রবীণ নেতা মরহুম সাদেক হোসেন খোকার পুত্র। পিতার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ‘ও’ ও ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করার পর যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবন শেষে কিছু সময় যুক্তরাজ্যে মোটরগাড়ি শিল্পে কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি পারিবারিক ব্যবসা ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেন। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইশরাক হোসেন ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এরপর থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা শুনে সহযোগিতা করে আসছেন বলে তার সমর্থকদের দাবি। বর্তমানে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইশরাক হোসেন প্রতিদিন দীর্ঘ প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে টানা মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তাদের সমস্যার কথা শোনা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে অনুসরণ করার দৃশ্য অনেকের কাছেই ছিল ব্যতিক্রমী। কারও যেন কষ্ট নিয়ে ফিরে যেতে না হয়, সে বিষয়েও তিনি সচেষ্ট ছিলেন বলে উপস্থিতরা জানান। কেউ অপেক্ষা করে বিরক্ত হচ্ছেন কি না, কার সমস্যা আগে সমাধান করা প্রয়োজন—এসব বিষয়েও তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখছিলেন।
রাজনীতিতে নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো মানুষের আস্থা অর্জন করা। সেই আস্থা তৈরি হয় কেবল বক্তৃতা কিংবা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নয়; বরং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। ইশরাক হোসেনের সমর্থকদের মতে, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক আচরণই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তারা বিশ্বাস করেন, মানুষের জন্য কাজ করার এই মানসিকতা ভবিষ্যতেও তাকে আরও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে পরিণত করবে।
দিনশেষে কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময়ও মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কারও মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি, কারও চোখে ছিল নতুন আশার আলো। এমন একটি কর্মব্যস্ত দিন অনেকের কাছেই প্রমাণ করেছে—রাজনীতির মূল শক্তি যদি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা হয়, তবে মানুষের ভালোবাসাই একজন নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।