ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬,
সময়: ১২:২৬:১৫ AM

প্রাণখোলা একজন ভাল মানুষ জয়নুল আবদিন ফারুক

মান্নান মারুফ
25-05-2026 01:35:19 PM
প্রাণখোলা একজন ভাল মানুষ জয়নুল আবদিন ফারুক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি নাম জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং নোয়াখালীর সাধারণ মানুষের কাছে একজন আপন মানুষ, সাহসী কণ্ঠস্বর এবং নির্ভরতার প্রতীক। রাজনৈতিক জীবনে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চললেও মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবসময়ই ছিল আন্তরিক ও গভীর। তবে তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাণখোলা একজন ভাল মানুষ। তার ভেতরে কোনো কপটতা নেই। তিনি যা মনে করেন, সরাসরি তা বলার সাহস রাখেন। এই স্পষ্টবাদিতার কারণেই তিনি রাজনৈতিক মহলে যেমন সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি সম্মানও পেয়েছেন।

সাধারণ মানুষ তাকে ভয় পায় না, বরং শ্রদ্ধা  করে এবং ভালোবাসে। কারণ তিনি সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সুখে-দুঃখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এলাকার মানুষ বলেন, জয়নুল আবদিন ফারুক যখন এলাকায় যান, তখন তিনি কোনো আনুষ্ঠানিকতা মানেন না। কখনো কারও ঘরে, কখনো দোকানে, আবার কখনো কৃষকের খামারে গিয়ে নিজেই খোঁজখবর নেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, পারিবারিক সমস্যা ও চাহিদার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

তার সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন তার অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে। কে তাকে ভোট দিয়েছে, কে দেয়নি কিংবা কে কোন রাজনৈতিক দলের বা কোন ধর্মের—এসব তিনি গুরুত্ব দেন না। তার কাছে এলাকার প্রতিটি মানুষ সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এলাকার সবাই তার আত্মীয়স্বজন; কেউ ভাই, কেউ বন্ধু। এই আন্তরিকতা ও সহজ মেলামেশার কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

জয়নুল আবদিন ফারুক ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি স্পষ্টভাষী, সাহসী এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।

রাজনৈতিক উত্থান

তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালের ১২ ফেরুয়ারী নিবার্চনে বিজয় লাভ করলে এ নিয়ে  মোট ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। 

তিনি নোয়াখালী-১ ও নোয়াখালী-২ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন স্পষ্টভাষী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। অনেক সময় তার বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তবে তিনি সবসময় নিজের অবস্থানে দৃঢ় থেকেছেন।

বিরোধীদলের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব

২০০৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আলোচনায় আসেন। সংসদে এবং রাজপথে তিনি বিরোধী দলের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। জয়নুল আবদিন ফারুকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১১ সালের জুলাই মাসে। সে সময় সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি হরতাল কর্মসূচি পালন করছিল। ৬ ও ৭ জুলাইয়ের হরতাল চলাকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিএনপির সংসদ সদস্যরা মিছিল বের করেন। মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জয়নুল আবদিন ফারুক।

এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ এবং  বিপ্লব কুমার সরকার-এর নেতৃত্বে পুলিশ তার ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পুলিশ তাকে বেধড়ক মারধর করে, লাঠি ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন  এই নির্যাতিত নেতা।

ঘটনাটি সে সময় জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিএনপি অভিযোগ তোলে, এটি ছিল বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা। পরে জয়নুল আবদিন ফারুক সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেন। যদিও পরবর্তীতে আদালতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।

মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন নয়। জয়নুল আবদিন ফারুকও এর ব্যতিক্রম নন। ২০১৩ সালের ৩ জুলাই সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নাশকতার অভিযোগ এনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। পরে তিনি আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।

রাজনৈতিক সহকর্মীরা মনে করেন, তিনি সবসময়ই সরকারের সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন বলেই বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এবং বিএনপির আদর্শথেকে সরে আসেননি।

২০২৪ সালের মামলা

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আবারও আলোচনায় আসেন। ১৯ আগস্ট তিনি ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২০১১ সালের হামলার ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করা হয়।

এই মামলায় হারুন অর রশীদবিপ্লব কুমার সরকার-কে আসামি করা হয়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। এই ঘটনাকে অনেকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সাধারন মানুষ।

ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা

জয়নুল আবদিন ফারুককে অনেকে রাগী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাণখোলা একজন ভাল মানুষ। তার ভেতরে কোনো কপটতা নেই। তিনি যা মনে করেন, সরাসরি তা বলার সাহস রাখেন। এই স্পষ্টবাদিতার কারণেই তিনি রাজনৈতিক মহলে যেমন সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি সম্মানও পেয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিজের মতো করে অনুভব করেন। এজন্য এলাকার মানুষ তাকে আপনজন মনে করে। অনেকেই বলেন, দূর থেকে তাকে ভুল বোঝা যায়, কিন্তু কাছ থেকে জানলে তার মানবিকতা উপলব্ধি করা সম্ভব।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জয়নুল আবদিন ফারুক একজন সংগ্রামী ও স্পষ্টভাষী নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আন্দোলন, নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণ—সবকিছুর মধ্য দিয়েও নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ধরে রেখেছেন। নোয়াখালীর সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

তিনি শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্য নন; বরং এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি জনমানুষের সঙ্গে মিশে থাকতে ভালোবাসেন। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা এবং সহজ জীবনযাপন তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।

নোয়াখালি এলাকার রিকশাচালক রহমত জানান, “আমরা তাকে ভয় পাই না, তবে শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। তিনি এলাকায় আসলেই আমাদের খোঁজখবর নেন। আমরা জয়নুল আবদিন ফারুক-কে সাধারণ মানুষের বন্ধু হিসেবে দেখি। তবে তাকে বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রী হিসাবে দেখতে চায় রহমত।”

একই এলাকার অটোরিকশাচালক আক্কাস বলেন, “তিনি আমাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মতোই মিশে যান। এলাকায় প্রতিবার এসে খোঁজখবর নেন। অনেক সময় সাহায্য-সহযোগিতাও করেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি নিজেও উপস্থিত থাকেন এবং গরিব মানুষকে উৎসাহ দেন।”