ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:৪৬:০৫ PM

বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব: ২০২৬ সালের নতুন দৃষ্টান্ত

মান্নান মারুফ
10-06-2026 02:46:05 PM
বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব: ২০২৬ সালের নতুন দৃষ্টান্ত

বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; বাংলাদেশে এটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা ও উৎসবের নাম। চার বছর পরপর আয়োজিত এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে ঘিরে দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত এলাকাতেও তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে মাঠের লড়াইয়ের বাইরে বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব ক্রয় ও সম্প্রচার প্রক্রিয়াও বারবার আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নেওয়া দুটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত এখন জনমনে তুলনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, চার বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব ক্রয়ে ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়েছে বলে সরকারের দাবি। ফলে অতীতের ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৬ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিটিভির জন্য বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব সংগ্রহ করবে বিটিভি।

এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরপরই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, তমা কনস্ট্রাকশন দেশের একটি পরিচিত নির্মাণ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রচারস্বত্ব ব্যবসার সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে অনেকের কাছেই বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হয় যে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ ক্রীড়া আসরের সম্প্রচারস্বত্ব ব্যবসায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত হলো।

তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব প্রথমে ফিফা থেকে কিনেছিল ভারতের ভায়াকম-১৮। এরপর সেটি একাধিক প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে নরওয়েস্টার ওমর কে স্পোর্ট জয়েন্ট ভেঞ্চারের কাছে যায়। পরবর্তীতে সেই স্বত্ব কিনে নেয় তমা কনস্ট্রাকশন। শেষ পর্যন্ত বিটিভি তমার কাছ থেকেই সম্প্রচারস্বত্ব সংগ্রহ করে।

এই দীর্ঘ মধ্যস্বত্বভোগী শৃঙ্খল শুরু থেকেই সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, যত বেশি মধ্যস্থতাকারী যুক্ত হবে, ব্যয় তত বাড়বে। আর সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে রাষ্ট্রকে। প্রশ্ন ওঠে, সরাসরি উৎস বা স্বত্বধারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ না করে কেন এতগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হলো।

বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন জানা যায়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপের ৬৪টি ম্যাচ সম্প্রচারের জন্য বিটিভিকে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অর্থ বিভাগ প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫৪ কোটি টাকার একটি ব্যয় কাঠামো বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই সীমা অতিক্রম করে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অর্থ বিভাগ তখন স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, বিশ্বকাপ শুরুর আগে সময় খুব কম থাকায় বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সীমিত ছিল। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপের সময়সূচি বহু বছর আগেই নির্ধারিত থাকে। ফলে শেষ মুহূর্তের সময়সংকটকে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য যুক্তি হিসেবে দেখানো কঠিন।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তমা কনস্ট্রাকশনের ভূমিকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আতাউর রহমান ভুইয়া, যিনি মানিক নামেও পরিচিত, তখন দাবি করেছিলেন যে বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে তাদেরও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়েছে এবং ৯৮ কোটি টাকার চুক্তি অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেখানে ব্যবসার সুযোগ থাকবে, সেখানে অংশগ্রহণ করাই স্বাভাবিক।

তবে সমালোচকেরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। তাদের প্রশ্ন ছিল, কীভাবে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের বাজারে প্রবেশ করল এবং কেন রাষ্ট্র সরাসরি উৎস থেকে স্বত্ব সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়নি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও আলোচনায় আসে। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

২০২২ সালের পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে ওঠা বহু প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর কখনোই জনসমক্ষে আসেনি। বিশেষ করে কেন একাধিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্বত্ব কিনতে হলো, কেন ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পেল এবং কেন আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি—এসব প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।

চার বছর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে বলে দাবি করছে। এবার বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ। ভ্যাট ও অন্যান্য কর যুক্ত হলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের দাবি অনুযায়ী এই অর্থের বড় অংশই বিজ্ঞাপন, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাছে সম্প্রচার অধিকার বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এখানেই ২০২২ ও ২০২৬ সালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে ৬৪টি ম্যাচ সম্প্রচারের জন্য ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। অথচ ২০২৬ সালে ১০৪ ম্যাচের সম্প্রচারস্বত্বের জন্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। যদিও দুটি বিশ্বকাপের বাজার বাস্তবতা, বাণিজ্যিক মূল্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়, তবুও এই ব্যয়ের পার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বর্তমান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা ও অস্বচ্ছতার কারণেই ব্যয় বেড়েছিল। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন, সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সম্প্রচারস্বত্ব কেনায় উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। মন্ত্রণালয় সূত্রের দাবি, সরাসরি উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্প্রচারস্বত্ব সংগ্রহের নীতি গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্রয়ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠারও একটি উদাহরণ।

তবে সরকারের এই সাফল্যের দাবির পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের সম্প্রচারস্বত্ব কেনার ক্ষেত্রে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে কোনো ধরনের ব্যক্তি-নির্ভর সিদ্ধান্ত, মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাব কিংবা অস্বচ্ছতার সুযোগ না থাকে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের উদ্যোগটি ২০২২ সালের বিতর্কিত প্রক্রিয়ার বিপরীতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একদিকে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী, উচ্চ ব্যয় এবং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের অভিযোগ; অন্যদিকে রয়েছে সরাসরি ক্রয়, তুলনামূলক কম ব্যয় এবং স্বচ্ছতার দাবি।

বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যখন কোটি মানুষ মাঠের লড়াই উপভোগ করার অপেক্ষায়, তখন পর্দার আড়ালের এই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ বিষয়টি শুধু ফুটবল দেখার নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রশ্ন। জনগণের করের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।

২০২২ সালের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ২০২৬ সালের নতুন উদ্যোগ তাই কেবল দুটি ভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির দুটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের এই অধ্যায় ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্রয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।