বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমানকে ঘিরে শত কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নেত্রকোনার কংস ও ভোগাই নদী খননের নামে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে নদীর নাব্য ফেরেনি। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করলেও বছরের পর বছর তা শেষ হয়নি। ফলে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদক সূত্র জানায়, ‘অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (প্রথম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথ)’ প্রকল্পের আওতায় মোহনগঞ্জ থেকে নালিতাবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথ খননের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ড্রেজিং শেষে শুষ্ক মৌসুমেও নির্ধারিত গভীরতা বজায় থাকার কথা ছিল। এ জন্য ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও শ্রমিক ব্যবহারেরও উল্লেখ ছিল। তবে দুদকের অনুসন্ধানে এসব কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের প্রাক্কলনে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ড্রেজিং দেখানো হয়। দরপত্রে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে খননের যে পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবে তার যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্ষা শেষে নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে থাকায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। দুদক ইতোমধ্যে প্রকল্পসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তদন্তে খননকাজের প্রকৃত পরিমাণ, সরানো মাটির হিসাব এবং বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া যাচাই করা হলেও এখনো অনুসন্ধান শেষ হয়নি।
প্রকল্পকে ঘিরে আরও অভিযোগ রয়েছে, নদী খননের আড়ালে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক বালু উত্তোলন ও বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কার্যাদেশ পাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনাহীনভাবে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে বিক্রি করলেও নদীর কাঙ্ক্ষিত গভীরতা নিশ্চিত করা হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ উত্তোলনের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিআইডব্লিউটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং সে সময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
দুদক সূত্রের দাবি, ভোগাই ও কংস নদী খননের নামে অর্থ আত্মসাতের বিভিন্ন নথি তাদের হাতে এসেছে। সেই সূত্র ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী এবং দুই নির্বাহী প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের মতো তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
মো. ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও পৃথক অনুসন্ধান চলছে। একই অনুসন্ধানের আওতায় তার স্ত্রী শামিমা আক্তার এবং বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সম্পদও যাচাই করা হচ্ছে। ২০২০ সালে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া আয়কর নথিতে স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ প্রাপ্তির যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রসিদের বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও কুড়িগ্রামে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেয়নি।
ছাইদুর রহমানের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও বিআইডব্লিউটিএর ভেতরে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রধান প্রকৌশলী পদে সম্ভাব্য নিয়োগের আলোচনা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে অভিযোগকারীদের মত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয়েছে কি না, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কাজ হয়েছে, বিল অনুমোদনের ভিত্তি কী ছিল এবং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কারা দায়িত্বে ছিলেন—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ নদী খননের জন্য বরাদ্দ অর্থ জনগণের, তাই এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. ছাইদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, মো. ছাইদুর রহমানকে ড্রেজিং বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো অগ্রগতি নেই এবং বিষয়গুলো আগের অবস্থাতেই রয়েছে।