ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০১:২৭:৫২ AM

শিক্ষা প্রকৌশল প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুদকে

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
17-09-2026 08:05:48 PM
শিক্ষা প্রকৌশল প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুদকে

সিন্ডিকেট গঠন, বদলি-বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন ও নিয়োগে অনিয়ম, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে অর্থ লেনদেন এবং অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, কিছু এসেছে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।

মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বর্তমানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি ও কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতার অভিযোগ আছে। ওই সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়নকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও তারা বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি-বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্বকালে পছন্দের পদে বসানোর কথা বলে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগ নিয়ে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য করা হয়েছে। অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী দাবি করেছেন, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পদায়ন, তাঁদের আবেদন, আদেশের সময় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, উদ্দেশ্যমূলক বদলি ও পদায়নের কারণে কর্মকর্তারা কয়েকটি পৃথক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরেও বদলি নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন প্রকাশ্যে আসে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়নে ইইডির ভেতরে বাধা তৈরি হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তখন একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছিল। ওই সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের নিচের সারির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি অর্থ গ্রহণের পরিবর্তে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হয়।

প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, সে প্রশ্নও সামনে আসে।

নির্মাণকাজের মান ও সময় নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণে যেখানে নয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা, সেখানে কোনো কোনো প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইইডিকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ওই চিঠির জবাবেও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি।

অধিদপ্তরের অতীতের নিয়োগ ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে জড়িত একটি সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

অন্যদিকে, তারেক আনোয়ার জাহেদীর দায়িত্বকালে অধিদপ্তরের অনিয়ম নিয়ে তাঁর ভূমিকার একটি ভিন্ন চিত্রও সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে ইইডির সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি একটি লিখিত আবেদনের মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে—অধিদপ্তরের অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া—তার বিপরীতে অন্তত একটি সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁর স্বাক্ষরিত তদন্ত-নির্দেশের নথি পাওয়া যাচ্ছে।

আরও একটি ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সরাসরি নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এক প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হাসান শওকত অর্থগুলো ঠিকাদারদের বলে দাবি করেন এবং নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে; সদস্য হিসেবে রাখা হয় ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। অর্থাৎ যে অধিদপ্তরের প্রধানকে ঘিরে নানা অভিযোগ উঠছে, সেই প্রধান প্রকৌশলীকে আবার অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত কমিটির সদস্যও করা হয়েছে।

হাসান শওকতের দপ্তরের অর্থ লেনদেনের ওই ঘটনা নিয়ে তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি এবং এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, ২০২৬ সালের আগস্টে আরেক ঘটনায় ইইডির সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্রে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নথি অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগকারী ঠিকাদার দাবি করেন, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও কাজটি দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ঘটনায় তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন।

এই ধারাবাহিক ঘটনায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তারেক আনোয়ার জাহেদী অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন, নাকি তাঁর অধীনস্থদের অনিয়মের অভিযোগগুলো কেবল তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে?

তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পদে বহাল থাকার চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পদ ধরে রাখতে তিনি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তদবির করেছেন।

তাঁর নিজ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্যের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল এবং ওই সময় তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তাঁর নামে-বেনামে সম্পদ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার দাবিও করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করা হলেও তাঁদের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা যায়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁর বর্তমান যোগাযোগ রয়েছে—এমন দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরেক কর্মকর্তার দাবি, তারেক আনোয়ার জাহেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক জায়গায় বদলি বা পদায়ন পেয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা নিয়েও অভিযোগের মধ্যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একজন দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বড় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে এবং তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিষয়েও অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।