ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৩:৩১:৩৫ PM

সরকারের সাড়ে ছয় মাস: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
16-09-2026 02:44:54 PM
সরকারের সাড়ে ছয় মাস: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের পর আগস্টের শেষ নাগাদ প্রায় সাড়ে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। এই সময়ে সরকার অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, তরুণদের কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, প্রবাসী কল্যাণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূল্যায়নে প্রথম ১৮০ দিনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। 

অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবাহ

সরকারের প্রথম কয়েক মাসে অর্থনীতির অন্যতম ইতিবাচক সূচক ছিল মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক হ্রাস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুনে ৯.১৬ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে নেমে আসে এবং আগস্টে তা আরও সামান্য কমে ৮.২৬ শতাংশ হয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৭.০২ শতাংশে নেমেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি। 

বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রেও উন্নতির তথ্য রয়েছে। মার্চ–আগস্ট ২০২৬ সময়ে বাংলাদেশ ১৮.৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেশি। 

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মুডিজ বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের দৃষ্টিভঙ্গি ‘নেগেটিভ’ থেকে ‘স্টেবল’ করেছে এবং B2 রেটিং বহাল রেখেছে। সংস্থাটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমার বিষয়গুলোকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করলেও ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব পরিস্থিতিকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সময়ে S&P জুলাইয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ‘স্টেবল’ থেকে ‘নেগেটিভ’ করেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক রেটিং পরিস্থিতিকে একমুখী সাফল্য হিসেবে না দেখে মিশ্র চিত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তরুণ উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান

তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘UDYOG—Upazila-Driven Youth Opportunity for Growth’ কর্মসূচি চালু করেছে। এর আওতায় উপজেলা পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তা শনাক্তকরণ, প্রশিক্ষণ এবং অর্থায়নের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়। 

এটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে। তবে কতজন তরুণ বাস্তবে ঋণ পেয়েছেন এবং কতটি উদ্যোগ টেকসই হয়েছে—তার পূর্ণ ফলাফল মূল্যায়নের জন্য আরও সময় ও পরিসংখ্যান প্রয়োজন।

অবকাঠামো ও উন্নয়ন

সরকারের সময়কালে মেট্রোরেল, রেল যোগাযোগ, সড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে এসবের বড় অংশই প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন বা বাস্তবায়ন-পর্যায়ের উদ্যোগ; তাই এগুলোকে সম্পন্ন অবকাঠামো হিসেবে উপস্থাপন না করে ‘চলমান অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করাই তথ্যগতভাবে সঠিক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: পুনর্বাসন ও বিচার

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য সরকার চাকরির ব্যবস্থা করেছে। ২৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ৭৪ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়; তাঁদের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, গুম ও হত্যার শিকার পরিবারের সদস্য এবং আহত ব্যক্তিদের স্বজন ছিলেন। BBSS+1

বিচারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং পাঁচজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়। এটি আদালতের রায়; ফলে একে সরকারের সরাসরি বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, সরকারের আমলে সংঘটিত বিচারপ্রক্রিয়ার ফল হিসেবে উপস্থাপন করা অধিক নির্ভুল। 

সুশাসন ও সামাজিক কল্যাণ

সরকার প্রথম ছয় মাসে Family Card, Farmer Card, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সরকারের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

সরকারের অগ্রগতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি সরবরাহ, প্রশাসনিক সমন্বয়, রাজনৈতিক নিয়োগ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু সূচকে অগ্রগতি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি খাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পাওয়া যায়নি। 

বিশেষ করে সেপ্টেম্বরেও শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনে আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের কারণে শিল্প উৎপাদন ও সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। 

প্রথম সাড়ে ছয় মাসে তারেক রহমান সরকারের কার্যক্রমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু ইতিবাচক সূচক, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তা কর্মসূচি, সামাজিক কল্যাণ, অবকাঠামো প্রকল্প এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ স্পষ্ট। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ, ব্যাংকিং খাত দুর্বল, জ্বালানি সংকট অব্যাহত এবং আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অতএব, সরকারের প্রথম পর্যায়ের মূল্যায়নকে একতরফাভাবে ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে বাস্তবায়িত কর্মসূচি, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং অবশিষ্ট সমস্যার ভিত্তিতে বিচার করাই অধিক তথ্যনির্ভর। আগামী সময়ে এসব উদ্যোগ কতটা মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতায় স্থায়ী পরিবর্তন আনে—সেটিই সরকারের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হবে।