বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি হস্তান্তরে সহযোগিতা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বগুড়া সমন্বিত কার্যালয়ে পৃথক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী সৈয়দা নুজাহাত সুলতানা। এর আগে গত ৩ আগস্ট নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি অভিযোগগুলো প্রকাশ করেন। অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট জেলা প্রশাসক ও দুদকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
লিখিত অভিযোগে নুজাহাত সুলতানা উল্লেখ করেন, তার স্বামী সৈয়দ জয়নাল আবেদীনের মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে একাধিক আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ১১১৪ নম্বর নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ২০১৪ সালের একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তিতে ডেভেলপার মো. মঞ্জুর আলম ৮ দশমিক ৪০ শতক জমি মোছা. রীতি জিনাত পারভীনের নামে হস্তান্তর করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ডেভেলপারের সঙ্গে সম্পাদিত উন্নয়ন চুক্তির মেয়াদ ২০১৮ সালেই শেষ হয়ে যায়। পাশাপাশি সম্পত্তি নিয়ে একাধিক দেওয়ানি ও আপিল মামলা বিচারাধীন এবং আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশও রয়েছে। এরপরও একই সম্পত্তির ফ্ল্যাট, দোকান ও শোরুম বিক্রি এবং দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নুজাহাত সুলতানার দাবি, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবং মালিকানা নিয়ে বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পাল প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলিল নিবন্ধন করেন। তার অভিযোগ, দায়িত্বের অপব্যবহার করে অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করারও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, "আমার জমি বারবার বেআইনিভাবে হাতবদল করা হচ্ছে। আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং রেজিস্ট্রি অফিসে আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও তা আমলে নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জমিটি অন্যের নামে নিবন্ধন করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। আমি সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
খাজনা পরিশোধের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর উপজেলায় অনিমেষ পালের পরিবারের নামে প্রায় ৩২৫ দশমিক ৪৯ শতক জমির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। জমিগুলোর মালিক হিসেবে তার বাবা অসিত কুমার পাল ও মা গীতা পালের নাম রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব সম্পদের বৈধ উৎস, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব ও সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শেরপুর উপজেলার খেরুয়া মসজিদসংলগ্ন এলাকায় ২৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন অনিমেষ পাল। ওই জমির অংশীদার হিসেবে তার কার্যালয়ের সাবেক কেরানি তানজিলের নামও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জমির দলিল নিবন্ধনে সহযোগিতা করেন বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. জালাল মিয়া। এ বিষয়ে জালাল মিয়া বলেন, জমির দলিল সম্পাদনে তিনি সহযোগিতা করেছেন, তবে জমিতে তার কোনো মালিকানা নেই।
এদিকে আদালতের একটি মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ একটি জমি-সংক্রান্ত তদন্তে অনিমেষ পাল দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন দেন। প্রথম প্রতিবেদনে ১৯৫৬ সালের ২৭৭ নম্বর ভলিউম মূল রেজিস্ট্রি বইয়ে নেই বলে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে ভলিউমটি রয়েছে, তবে অধিকাংশ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত ও লেখা অস্পষ্ট বলে জানানো হয়। বিষয়টি আদালতের নজরে এলে বগুড়া সদর আদালতের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন।
ওই মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, জাল সার্টিফায়েড কপি তৈরি ও দলিলের মূল পাতা পরিবর্তনের অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে একই বিষয়ে দুটি ভিন্ন প্রতিবেদন দেওয়া হয়, যা তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা বলে তাদের অভিযোগ।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পাল কোনো মন্তব্য করেননি। প্রথমে তিনি পরে কথা বলার আশ্বাস দিলেও নির্ধারিত সময়ে তার কার্যালয়ে গেলে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বগুড়ার জেলা রেজিস্ট্রার সিরাজুল ইসলাম বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কর্মরত জেলায় ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়ে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক তৌশিকুর রহমান বলেন, অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা মিললে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।