ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:২৪:২২ AM

রংপুরে মাদ্রাসার সম্পত্তি নিয়ে অর্ধকোটি টাকা বেহাত

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
06-08-2026 02:49:14 PM
রংপুরে মাদ্রাসার সম্পত্তি নিয়ে অর্ধকোটি টাকা বেহাত

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার জমি বন্ধক রেখে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত ৯ এপ্রিল এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি তদন্তে উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

অভিযুক্ত মো. শহীদুল ইসলাম মুন্সি বেতগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার সভাপতি। একই ঘটনায় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে মাদ্রাসার ১৮ শতক জমি জোরপূর্বক দখলে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে শহীদুল ইসলাম মুন্সি মাদ্রাসার প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তহবিলের টাকা আত্মসাৎ এবং মাদ্রাসার মালিকানাধীন জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে।

বেতগাড়ী তহশিল অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বেতগাড়ী মৌজার একাধিক দাগে প্রায় ১৬ বিঘা জমি মাদ্রাসার নামে রয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ মার্চ ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে মাদ্রাসার নিজস্ব জমির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর, অর্থাৎ স্থানীয় হিসেবে প্রায় ১৯ বিঘা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই জমির একটি বড় অংশ বন্ধক দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ ছাড়া একই মৌজার ১০৫৮ নম্বর দাগের ১৮ শতক জমি ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজ দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক ভোগদখল করে আসছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমানকে। কমিটি প্রথমে গত ৯ জুন সরেজমিন তদন্তের দিন নির্ধারণ করলেও মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ থাকায় তদন্ত পেছানো হয়। পরে নতুন তারিখে তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাদী, বিবাদী, সাক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেন।

স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, তাঁরা দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে মাদ্রাসার জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করছেন। বাচ্চা মিয়া নামে এক কৃষক বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২৪ শতক জমিতে আবাদ করছেন। প্রতি বছর মাদ্রাসায় টাকা জমা দিলেও তাঁকে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না বলে দাবি করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। তবে তাঁরা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, তিনি মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার সময় জমি-সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, জমি আবাদকারীরা মাদ্রাসায় অর্থ জমা দেন এবং সেই অর্থের রসিদও রয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো রসিদ বা সংশ্লিষ্ট নথি দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসাসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের জমি ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকলেও সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অনিয়ম চলে আসছে।

জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদুল ইসলাম মুন্সি। তিনি বলেন, মাদ্রাসার কোনো জমি বন্ধক দেওয়া হয়নি। সব জমি নিয়ম অনুযায়ী বর্গা দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়। প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তিনি। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, বাদী, বিবাদী, সাক্ষী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। আরও কিছু দাপ্তরিক নথি সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমীন আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে প্রয়োজনীয় কিছু নথি পাওয়া যায়নি। তাই বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর জেলা প্রশাসন বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।