ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:২৪:২৯ AM

৬৯ কোটি দুর্নীতি: উপসচিবের নথি ফাঁস

ষ্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
06-08-2026 12:08:41 PM
৬৯ কোটি দুর্নীতি: উপসচিবের নথি ফাঁস

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের একজন উপসচিবের বিরুদ্ধে ৬৯ কোটি টাকার আর্থিক চুক্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কন্ট্রোলার অব স্টোর্স ও উপসচিব মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ। এ ঘটনায় একটি লিখিত সম্মতিপত্র ও আর্থিক চুক্তির নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নিশ্চিত করতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আর্থিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, পদায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ৩০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট ব্যবস্থা করবে এবং পদায়নের পর ওই অর্থের দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬০ কোটি টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ৯ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ হিসেবে মোট ৬৯ কোটি টাকা ১৮ মাসের মধ্যে পরিশোধের বিষয়ে লিখিত সম্মতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এই অর্থের একটি বড় অংশ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার অর্থায়নের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে।

কথিত সম্মতিপত্রে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৯ মার্চ মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজের পরিচিতি নম্বর, পদবি ও ব্যাচ উল্লেখ করে একটি লিখিত ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হলে দায়িত্ব গ্রহণে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে না। প্রশাসনিক রীতিনীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো পদে আগাম লিখিত সম্মতি প্রদানের বিষয়টি অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নথির আরেক অংশে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা বন্দর এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ীকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যবসায়ীকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একজন সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তা নিজের পদায়নসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে লিখিতভাবে প্রতিনিধিত্বের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ কথিত নথিতে থাকা নিজের স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ভালো একটি পদায়নের আশায় একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই বদলির ক্ষেত্রেও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তদবির ও অর্থ লেনদেনের ভূমিকা ছিল। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।

প্রশাসন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনো পদে পদায়নের জন্য অনৈতিক তদবির বা আগাম সম্মতি প্রদানের ঘটনা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং পরবর্তী সংশ্লিষ্ট বিধানের পরিপন্থী হতে পারে। একই সঙ্গে বিষয়টি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের আওতায় পড়ে শাস্তিযোগ্য হতে পারে, যদি অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়।

এ ছাড়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে আর্থিক লেনদেন, তৃতীয় পক্ষকে ব্যবহার বা ঘুষসংক্রান্ত অভিযোগ সত্য হলে তা দুর্নীতিবিরোধী আইন এবং ফৌজদারি আইনের আওতায় তদন্তযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি প্রশাসনিক মহলে জোরালো হচ্ছে।

তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল বা চূড়ান্ত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।