ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৫৪:৪২ AM

ছাত্রদল-শিবির দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত ক্যাম্পাসগুলো

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
04-08-2026 05:54:39 PM
ছাত্রদল-শিবির দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত ক্যাম্পাসগুলো

ঢাকা, ৪ আগস্ট: জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে একই মঞ্চে অবস্থান করা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোমুখি অবস্থানে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান পৃথক হওয়ার পর থেকেই দুই ছাত্রসংগঠনের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিরোধ সংঘর্ষ, হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই সংগঠনের সংঘর্ষে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণেরই প্রতিফলন?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সকালে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফসহ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সাংবাদিকও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।

আহতদের চিকিৎসার জন্য ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে আহত শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঘটনার পর জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও অস্থায়ী আবাসনের দাবিতে আন্দোলন করায় তাদের ওপর হামলা হয়েছে। তিনি হামলার নিন্দা জানিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

একই দিন দুপুরে ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানস্থল সাজানোর সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়, তাদের নেতাকর্মীরাই হামলার শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন।

বিকেলে রাজধানীর সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে।

এর আগের দিন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্যমতে, অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। পরদিন দুই সংগঠন একই সময়ে কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারি করে।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর দেশের অন্যান্য বড় বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অবস্থান এবং জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণের প্রভাব শিক্ষাঙ্গনেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রদলের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে লেখেন, ছাত্রদল যদি ছাত্রলীগের পথ অনুসরণ করে, তবে তাদের পরিণতিও কঠিন হবে। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

অন্যদিকে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক ছাত্রশিবির নেতা আবু সাদেক কায়েম দাবি করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সশস্ত্র হামলায় জকসুর ভিপি, জিএস, ছাত্রশিবির, ইনকিলাব মঞ্চ, ছাত্রশক্তি, সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্যাম্পাস ও হল দখলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, দলীয় আধিপত্য, সিট বাণিজ্য ও হল দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে সব ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হলেও তা যখন সহিংসতা ও সংঘর্ষে রূপ নেয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে একাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসনকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়। তাদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল দুটি ছাত্রসংগঠনের বিরোধ নয়; বরং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাই সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত কারণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করাও জরুরি। অন্যথায় একটি ক্যাম্পাসের উত্তেজনা দ্রুতই দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।