দেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এবার সরাসরি জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরলেও মাঠের রাজনীতিতে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল সীমিত। তবে ঈদুল আজহার পর সেই পরিস্থিতি বদলাতে চায় এনসিপি।
দলীয় নেতারা বলছেন, কেবল আলোচনা, সেমিনার কিংবা ঘরোয়া কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা ও সংকটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। সেই লক্ষ্যেই রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনমুখী কর্মসূচি ও আন্দোলনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলটি।
এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি এখন সাংগঠনিক বিস্তার ও মাঠের রাজনীতিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে হলে আগে তৃণমূল পর্যায়ে জনভিত্তি শক্ত করা প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্যেই মানুষের বাস্তব সমস্যা নিয়ে সরাসরি আন্দোলনের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, নাগরিক সেবায় ভোগান্তি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্থানীয় প্রশাসনের অনিয়ম এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে ঘিরে ঈদের পর ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হলে ঈদের পর সরকারকে চাপে ফেলতে সংসদ ও রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে বিরোধী দল হিসেবে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে। কেবল আলোচনা বা ঘরোয়া কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; জনগণের বাস্তব সংকটের পাশে দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ঈদের পর মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। তারা মনে করছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির পাশাপাশি জনজীবনের বাস্তব সমস্যা নিয়ে মাঠে নামতে পারলে এনসিপি দ্রুত জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে সক্ষম হতে পারে।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনসিপি মূলত রাষ্ট্র সংস্কার, বিচারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তবে বাজারদর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা কিংবা শ্রমিক অধিকারের মতো নিত্যদিনের ইস্যুতে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কর্মসূচি তুলনামূলক কম ছিল। এখন সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জনগণের আরও কাছাকাছি যেতে চায় দলটি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক বিস্তারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় নতুন কমিটি গঠন, রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। দলীয় সূত্র বলছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসন্তুষ্ট ও বহিষ্কৃত নেতাদেরও দলে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে। নেতাদের বিশ্বাস, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, “আমরা এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এগোচ্ছি। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। ঈদের পর সেই আন্দোলন আরও জোরালো হবে। জনগণ আমাদের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে এবং অনেকেই আমাদের দলে যোগ দিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আরও নতুন নতুন চমক দেখা যাবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণ করা। মাঠপর্যায়ের বাস্তব রাজনীতি, জোটের সমীকরণ এবং স্থানীয় নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ—সব মিলিয়ে দলটিকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। তাদের মতে, ঈদের পর রাজপথে এনসিপির সক্রিয়তা শুধু নতুন কর্মসূচির সূচনা নয়; বরং নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়েরও বড় পরীক্ষা।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “ঈদের পর সংস্কার ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে সক্রিয় হবে এনসিপি। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখেই কর্মসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করতে চাই। তবে সরকার বাধা দিলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে।”
একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নেও নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে চায় দলটি। সংসদীয় সংশোধনের পরিবর্তে গণভোটভিত্তিক সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এনসিপি। দলীয় নেতাদের মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে সীমিত সংস্কার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নির্বাচনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি এনসিপি মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করতে পারে এবং জনজীবনের ইস্যুগুলোতে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে দলটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।