ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৫:২২ PM

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ৩২৪ কোটির রাজস্ব ফাঁকি

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
29-09-2026 03:12:46 PM
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ৩২৪ কোটির রাজস্ব ফাঁকি

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাব্য চিত্র উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। সংস্থাটির ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ও হস্তক্ষেপের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একটি চালানের খালাস স্থগিত করে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।

সিআইসি সূত্রে জানা গেছে, অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত ‘ইউনিক ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে দুই কনটেইনারে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকার তথ্য পাওয়ার পর চালানটির খালাস স্থগিত করা হয়। আমদানি পর্যায়ে ওই চালানের সঙ্গে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।

সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অ্যাসিটেট টো সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি কাঁচামাল। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এ পণ্যের আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এর প্রকৃত ব্যবহার, সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। এ সময় ইউনিক ট্রেডার্সের আমদানির বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে।

প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হয়। জবাবে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি তার নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। পাশাপাশি নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে ভ্যাট রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট দলিলও দাখিল করছে না। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এক চালানেই ৩২৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব
সিআইসি জানিয়েছে, অ্যাসিটেট টোর স্থানীয় ব্যবহার নিয়ে করা প্রাথমিক হিসাবেও বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকির চিত্র পাওয়া গেছে। সিগারেট উৎপাদনকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মূসক-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি এক কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব।

সে হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব। ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেট হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট।

মাঝারি শ্রেণির সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব করেছে সিআইসি।

অন্যদিকে, একই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে উচ্চ শ্রেণির সিগারেট উৎপাদন করা হলে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১৬০ টাকা এবং প্রায় ৮২ শতাংশ রাজস্ব হার বিবেচনায় নিলে এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে এসব হিসাব সম্ভাব্য উৎপাদন ও প্রযোজ্য রাজস্বহারের ভিত্তিতে করা প্রাথমিক হিসাব; প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার, উৎপাদন, বিক্রয় ও কর পরিশোধের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

এক অর্থবছরে আমদানি ৩ লাখ ৬২ হাজার কেজির বেশি
সিআইসির বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স আলোচ্য চালানসহ মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে। প্রতি কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদনের হিসাব বিবেচনায় নিলে এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ কারণে এসব আমদানির প্রকৃত ব্যবহারকারী, পণ্য সরবরাহের গন্তব্য এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিক্রয় বা হস্তান্তরের বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করছে সিআইসি।

আরও চার অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সন্ধান
অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে সিআইসি। সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানায় বাস্তব কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে দাখিলপত্র জমা দেয় না এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দলিলও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করছে না।

সিআইসির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো আমদানি করে পরবর্তীতে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করে থাকতে পারে। এর ফলে আমদানি পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা অ্যাসিটেট টোর প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য, বিক্রয়, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যাচাই চলছে। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এদিকে উচ্চ রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টোর আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে পণ্যটির সরবরাহব্যবস্থা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমদানিকারকের অস্তিত্ব ও প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাইয়ের পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য এবং পরবর্তী বিক্রয় বা হস্তান্তর অনুসরণ করা হলে এ ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।