নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘাত, গোলাগুলি ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে সে সময়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অনেকের বর্ণনায় উঠে আসে। ওই সময়ের সংঘাত-সহিংসতায় অভিযুক্ত কয়েকজনের পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কামরুজ্জামান রতন ও ইলিয়াস আলীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুটি প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলত। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এসব গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক গোলাগুলি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
বর্ণিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত একটি ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের মেয়াদের শুরুর দিকে এক দিনেই ছাত্রদল নেতা মির্জা গালিবসহ পাঁচজন নিহত হন। ওই সংঘর্ষের সময় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা গোলাগুলির মধ্যে কলাভবনের চতুর্থ তলায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে শুয়ে বা বসে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হয়েছিল বলে বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা, ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথি ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সূর্যসেন হলে এক রাতে দুইজন এবং জিয়াউর রহমান হলের বাইরে আরেকজনের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাও ওই সময়কার সংঘাতের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রতন ও ইলিয়াসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর বিরোধের যোগসূত্র ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তা নির্ধারণে তদন্ত, মামলা ও আদালতের নথি গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে কামরুজ্জামান রতন মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য । অতীতের সহিংসতার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনা টেনে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলতে পারেন—রাজনীতিতে নেতৃত্বের মূল্যায়নে অতীতের ভূমিকা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রামাণ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য অপরিহার্য।
একইভাবে, পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক তৎকালীন ছাত্ররাজনীতিতে ‘সগীর গ্রুপ’-এর সঙ্গে যুক্ত আরেক ব্যক্তির বর্তমান সংসদ সদস্য পরিচয় নিয়েও অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। তাঁর পরিচয়, অতীত কর্মকাণ্ড এবং কোনো সহিংস ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
নব্বইয়ের দশকের ক্যাম্পাস সহিংসতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুধু ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয় নয়; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার ইতিহাস সংরক্ষণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি রক্ষা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি। অতীতের ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং সরকারি নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা জরুরি। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নই পারে ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে স্পষ্ট করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় করে তুলতে।