ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৬:৫৩ AM

ত্যাগীদের মূল্যায়ন চায় বিএনপির তৃণমূল

মান্নান মারুফ
25-09-2026 12:29:12 PM
ত্যাগীদের মূল্যায়ন চায় বিএনপির তৃণমূল

দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন, সম্মান এবং সাংগঠনিক মর্যাদা দেওয়ার দাবি উঠেছে। দলের দুঃসময়ে যারা পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ সময় বিসর্জন দিয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তাদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান সময়ে তারা প্রত্যাশিত সম্মান ও মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তৃণমূলের এসব নেতাকর্মীর বক্তব্য, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। অনেকেই মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হামলা-মামলা এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ কেউ রাজপথে রাত কাটিয়েছেন, কেউ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়েছেন, আবার অনেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে পরিবার ও কর্মজীবনেও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, দল ক্ষমতায় গেলে কিংবা রাজনৈতিকভাবে সুদিন ফিরে এলে দীর্ঘদিনের ত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি মিলবে।

কিন্তু তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, সেই প্রত্যাশা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের পাশে নতুন করে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি, প্রভাবশালী মহল কিংবা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের পুরোনো নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল ভিত্তি হচ্ছে তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীসমাজ। দুঃসময়ে যারা দলের পতাকা ধরে রাখেন, সুসময়ে তাদের অবহেলা করা হলে সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাদের ভাষ্য, তারা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা বিশেষ সুযোগ দাবি করছেন না; তারা চান শুধু সাংগঠনিক মর্যাদা, সম্মান এবং দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব।

বিশেষ করে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও তৃণমূলের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং ব্যক্তিগত বলয় ও আত্মীয়স্বজননির্ভর রাজনীতির অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। তৃণমূলের দাবি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি দলের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের সাংগঠনিক ভূমিকা নিশ্চিত করেন।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আরও বক্তব্য, ৫ আগস্টের পর যারা নতুন করে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাদের সবাইকে একইভাবে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সমপর্যায়ে বিবেচনা না করে প্রত্যেকের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক অবদান ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের মতে, নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মর্যাদা রক্ষা করাও দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব।

তৃণমূলের এই অংশটি মনে করে, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আনুগত্য ও আদর্শের কারণে বহু নেতাকর্মী প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দল থেকে সরে যাননি। তাদের বক্তব্য, ব্যক্তির চেয়ে দল ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রধান কারণ।

এ অবস্থায় দলের নীতিনির্ধারকদের প্রতি তৃণমূলের আহ্বান—দ্রুত মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা, তাদের অভিযোগ শোনা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব কমিয়ে একটি কার্যকর সাংগঠনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে।

তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর প্রত্যাশা, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সরাসরি তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং স্পষ্টভাবে জানান যে দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা কর্মীদের অবদান দল ভুলে যায়নি, তাহলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা অনেকটাই দূর হতে পারে।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এসব নেতাকর্মীর বক্তব্যের সারকথা একটাই—তারা ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নয়, দলের প্রতি আনুগত্য ও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে এতদিন রাজপথে ছিলেন। তাই তাদের দাবি, নতুনদের স্বাগত জানানো হোক, কিন্তু পুরোনো ত্যাগীদের বিস্মৃত করা নয়। তাদের সম্মান, সাংগঠনিক মর্যাদা এবং অবদানের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হোক।

দলের প্রতি তাদের শেষ অনুরোধও তাই স্পষ্ট—দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের কাছে ফিরতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কিংবা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নয়; সেই শক্তির বড় অংশ নিহিত থাকে তৃণমূলের কর্মীদের নিষ্ঠা, ত্যাগ ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার মধ্যে।

মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন ও তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “রাজনীতিতে কর্মীরাই একটি দলের প্রাণশক্তি। বিএনপিও মনে করে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই দীর্ঘদিন ধরে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ ও বহন করে চলেছেন। তাই তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও যারা দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থেকেছেন, তাদের অবদান দল সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার বিষয়ে খোঁজখবর রাখার বিষয়টি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রিজভী আরও বলেন, ইতোমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, বিএনপি তার নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে আরও সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য মর্যাদা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে দল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে।