ঢাকা, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
সময়: ০৬:০৮:২৩ PM

বদলাবে কি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্র?

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
08-06-2026 06:08:23 PM
বদলাবে কি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্র?

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বাড়তে পারে প্রায় ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসতে যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যখাতে সরকারের অগ্রাধিকারকে নতুনভাবে তুলে ধরছে।তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়, বরং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে এবং এর মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা উন্নত হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে বরাদ্দ

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে।

এ বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ বাড়ছে ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। পাশাপাশি মোট বাজেটের অংশ হিসেবেও এ খাতের বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ।

সর্বোচ্চ বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ

চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত বিভাগগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থানে ছিল। তবে আগামী বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে বিভাগটি দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসতে পারে।

সরকারের দাবি, জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং চিকিৎসা খাতের সক্ষমতা বাড়ানোই এই বরাদ্দ বৃদ্ধির মূল লক্ষ্য।

শুধু বরাদ্দ বাড়লেই কি উন্নতি হবে?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে খাতটির উন্নয়ন মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বরং স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এবং মোট জাতীয় বাজেটের কত শতাংশ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

তাদের মতে, অতীতেও একাধিকবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু জিডিপির তুলনায় সেই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য ছিল না। ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও দৃশ্যমান হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান না। ফলে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও মানুষকে বড় শহর কিংবা রাজধানীমুখী হতে হয়।

এর ফলে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসাসেবার মানকে প্রভাবিত করছে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তারা বলছেন, এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে অধিকাংশ মা, শিশু এবং সাধারণ রোগী উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান। এতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং হাসপাতালের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা নতুন ভবন তৈরি নয়। বরং এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে রোগ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।

তাদের ভাষায়, একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তারও আগে প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্যখাতে বাড়তি বরাদ্দ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে এই অর্থ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বদলাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর।

যদি অতিরিক্ত বরাদ্দের বড় অংশ কেবল প্রশাসনিক ব্যয়, পরিচালন ব্যয় কিংবা অবকাঠামো সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

অন্যদিকে, যদি এই অর্থ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, মাতৃ ও শিশুসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার জনগণের স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসন এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে বাড়তি বরাদ্দ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।