রাজপথের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে যারা বছরের পর বছর বিএনপিকে কঠিন সময়ে টিকিয়ে রেখেছেন, দলের সুসময়ে এসে তাদের অনেকেই কেন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত—এ প্রশ্ন এখন দলটির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিপরীতে, দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে দৃশ্যমান না থাকা কিংবা অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা কয়েকজন ব্যক্তি দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় এই ক্ষোভ আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শামসুজ্জামান দুদু, জয়নূল আবদিন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাইফুল ইসলাম নীরব, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফর রহমান বাবর এবং আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকনের মতো দীর্ঘদিনের পরিচিত ও পরীক্ষিত নেতাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অনুসারীদের বক্তব্য, রাজপথের কঠিন সময়ে এসব নেতার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান; কিন্তু দলের সুসময়ে তাদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সাংগঠনিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে বাইরে রয়েছেন।
বিশেষ করে ঢাকার রাজনীতিতে সাইফুল ইসলাম নীরবের ভূমিকা নিয়ে তার অনুসারীরা দীর্ঘদিনের ত্যাগের কথা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকার রাজপথে আন্দোলন-মিছিল-সমাবেশে তিনি বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। হামলা, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের মধ্যেও তিনি মাঠে ছিলেন। নির্বাচনের আগে তার এলাকায় ব্যাপক কর্মী-সমর্থনের উপস্থিতিও দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়। অথচ শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন না দিয়ে শরিক দলের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ওই আসনে প্রত্যাশিত ফল না আসায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়।
যশোর-১ আসনে মফিকুল ইসলাম তৃপ্তির মনোনয়ন পরিবর্তনের ঘটনাও বিএনপির তৃণমূলে আলোচিত। দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, নির্বাচনের মাত্র ২০ দিন আগে তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে স্থানীয় পর্যায়ে হতাশা তৈরি হয়। তাদের ভাষ্য, তৃপ্তির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিশাল কর্মী-সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রভাব ভোটের ফলাফলেও পড়েছে।
আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকনের নামও আলোচনায় রয়েছে। বিএনপির আইনজীবী সংগঠন ও আদালত প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এই নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে দেখা যাবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তার অনুসারীদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অন্য একজনকে আসীন করা হলে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা রাশেদ খান, জোনায়েদ সাকী, নুরুল হক নুর, জাহিদ হাসানসহ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি বিএনপির তৃণমূলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—যারা দীর্ঘদিন বিএনপির দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন, তাদের তুলনায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে আসা ব্যক্তিরা কেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন?
তবে দলের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক কৌশল, জোটের সমীকরণ, প্রশাসনিক প্রয়োজন কিংবা নির্বাচনী বাস্তবতার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এসব সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যক্তিগত তোষামোদ বা আনুগত্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করাও যথাযথ নয়। তবে ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হতে পারে, সেটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্প্রতি জিয়ার মাজারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা হয়েছে। দলের দীর্ঘদিনের কিছু নেতার সেখানে প্রবেশ বা উপস্থিতি নিয়ে তাদের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভের কথাও সামনে এসেছে। এমনকি সাইফুল ইসলাম নীরবের আবেগাপ্লুত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও আলোচনা হয়েছে বলে তার অনুসারীরা দাবি করেছেন।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, দলের সুসময়ে নতুন কর্মী-সমর্থকের অভাব হয়তো হবে না; কিন্তু আবারও যদি কঠিন সময় আসে, তখন রাজপথে প্রয়োজন হবে সেই পরীক্ষিত নেতাদেরই। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক দলের দুঃসময়ে ত্যাগী কর্মীরাই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান। তাই বর্তমান সময়ে দলের দীর্ঘদিনের নেতাদের মূল্যায়ন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ দূর করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ পর্যন্ত কেন কারও পদ নেই, কেন কাউকে মনোনয়ন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কিংবা কেন নতুনদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—এসব সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ দলীয় হাইকমান্ডই সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবে। তবে তৃণমূলের নীরব ক্ষোভকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে সেটিই বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।