ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই নতুন সমীকরণের আভাস মিলছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে জোর আলোচনা। বিশেষ করে ঢাকায় নির্বাচনকেন্দ্রিক আলাপ-আলোচনা এখন যেন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে উঠেছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট কিংবা চলতি পথে—সবখানেই এখন নির্বাচনী ফলাফল ও সম্ভাব্য আসন সংখ্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ভোটের অঙ্ক কষছেন সাধারণ মানুষই। কেউ বলছেন, বিএনপি এককভাবে ২২০টি আসন পেতে পারে। আবার কেউ ধারণা করছেন, আসন সংখ্যা ২৪০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি কিছু আলোচনায় ২৫০ থেকে ২৬০ আসনের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসছে।
তবে শুধু বিএনপি নয়, জামায়াতকে ঘিরেও নানা আলোচনা রয়েছে। দলটির সমর্থকদের একাংশের দাবি, এবার জামায়াত ১৫৫টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সরকার গঠন সম্ভব না হলেও জামায়াত ১০০টির বেশি আসন পেতে পারে। সাধারণ ভোটারদের অনেকে মনে করছেন, জামায়াত এ নির্বাচনে একটি সম্মানজনক আসনসংখ্যা অর্জন করতে পারে। তাদের মতে, দলটি যদি সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে আড্ডায়-আলোচনায় ভিন্ন মতও শোনা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন জামায়াতই চমক দেখাতে পারে, আবার অনেকে বলছেন, নির্বাচনের আগে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। যদিও এসবই সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ, তবুও বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে জনমতের এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ধর্মভিত্তিক সমর্থন ও নতুন মাত্রা
নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জামায়াত ছাড়া ধর্মভিত্তিক বেশ কিছু সংগঠন, পীর ও ওলামা-মাশায়েখদের একটি অংশ মঙ্গলবার বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এ ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলও প্রকাশ্যে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এতে ভোটের সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে—জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংক ছাড়া অন্য কিছু ভোটার বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে বিভিন্ন জরিপে যে সম্ভাব্য আসন সংখ্যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তা আরও বাড়তে পারে—এমন ধারণাও শোনা যাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, সমর্থন ঘোষণা আর বাস্তব ভোটের অঙ্ক এক বিষয় নয়। মাঠপর্যায়ে সংগঠন শক্তি, প্রার্থী নির্বাচন এবং ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
সুত্রাপুরে আনিছের বিশ্লেষণ
রাজধানীর সুত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা আনিছ বলেন,
“এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অন্য রকম মনে হচ্ছে। অনেক দল প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। আমার ধারণা, বিএনপি আশানুরূপের চেয়েও বেশি আসন পেতে পারে। ২৪০ থেকে বেড়ে তা ২৬০-এও যেতে পারে।”
তার মতে, নির্বাচনের আগে যে রাজনৈতিক সমন্বয় ও সমর্থনের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা শহরাঞ্চলে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। নগর ভোটারদের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
সদরঘাটে রফিকের মত
সদরঘাট লঞ্চঘাটে যাত্রী রফিক বলেন,
“জামায়াত ছাড়া এখন অনেক দল বিএনপির দিকে এক হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোও সমর্থন দিয়েছে। এতে ভোটের হিসাব বদলে যেতে পারে। আমার ধারণা, বিএনপি আড়াইশোর বেশি আসন পেতে পারে।”
তার মতে, গ্রামাঞ্চলেও এই সমর্থনের প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে ভোটের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জামায়াত সমর্থকদের প্রত্যাশা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এবারের নির্বাচনকে দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। একজন সমর্থক বলেন, “আমাদের সংগঠন শক্তিশালী। এবার আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পাব। ১০০ থেকে ১৫০ আসন পাওয়া অসম্ভব নয়।”
তবে কিছু সাধারণ ভোটার মনে করেন, জামায়াত যদি সংসদে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটিই হবে তাদের জন্য বড় সাফল্য। ভবিষ্যতের রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত করতে পারলে পরবর্তী নির্বাচনে বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব—এমন মতও রয়েছে।
মহাখালীতে উত্তরবঙ্গের চিত্র
মহাখালী বাস টার্মিনালে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। তিনি বলেন,
“উত্তরাঞ্চলে জামায়াতের সংগঠন শক্তিশালী। কিছু আসনে তারা ভালো করতে পারে। তবে সারাদেশের হিসাব এখনো পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন দল একসঙ্গে বিএনপির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাদের আসন সংখ্যা বাড়তে পারে।”
রফিকুল ইসলামের মতে, উত্তরবঙ্গের কয়েকটি আসনে ত্রিমুখী বা বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। ফলে ফলাফল নিয়ে আগাম ধারণা দেওয়া কঠিন।
মাঠের আলোচনা বনাম বাস্তবতা
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে জনমতের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে কয়েকটি বাস্তব বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে—ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সংগঠন শক্তি, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের প্রচারণা।
রাজনৈতিক মহলে ভোট স্থানান্তর নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের ভোট কোন দিকে যাবে—এ ধরনের নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। সমর্থন ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও ভোটের দিন ভোটারদের গোপন সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।
রাজধানীতে নির্বাচনী উন্মাদনা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন জাতীয় রাজনীতি প্রধান আলোচ্য বিষয়। চায়ের দোকানে তরুণদের উত্তপ্ত তর্ক, অফিস শেষে কর্মজীবীদের বিশ্লেষণ, রিকশাচালক থেকে ব্যবসায়ী—সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন।
শুধু আসন সংখ্যা নয়, ভবিষ্যৎ সরকারের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়েও ভোটাররা ভাবছেন। অনেকেই মনে করছেন, এবারের নির্বাচনের ফল দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে?
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। কেউ বলছেন ২২০, কেউ ২৪০, কেউবা ২৬০—আবার কেউ জামায়াতের সম্ভাব্য উত্থানের কথাও বলছেন। সংখ্যার অঙ্ক যতই ঘুরে-ফিরে আসুক, চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে ভোটারদের রায়।
ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভোটারদের আগ্রহ ও রাজনৈতিক সচেতনতা এবার বেশ তীব্র। নতুন মোড় নেওয়া এই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণ কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।