ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৮:৫৯:৫০ PM

চাকরির ৭ বছরেই সোহেল শতকোটির মালিক

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
08-09-2026 07:33:47 PM
চাকরির ৭ বছরেই সোহেল শতকোটির মালিক

নিচের সংস্করণে ভাষা, বানান, বাক্যগঠন, পুনরুক্তি ও সাংবাদিকতাসুলভ ভারসাম্য ঠিক করেছি। অভিযোগগুলোকে অভিযোগ/দাবি হিসেবে রাখা হয়েছে এবং যেখানে স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন, সেখানে তা স্পষ্ট করা হয়েছে।আওয়ামী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পর উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা: সোহেল মিয়াকে ঘিরে প্রভাব-বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ
সরকার পরিবর্তন হলেও গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকার বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. সোহেল মিয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি-পদায়ন এবং সম্পদ অর্জন নিয়ে নানা অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এবার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. সোহেল মিয়াকে ঘিরে উঠেছে প্রভাব বিস্তার, পদায়ন-বদলি, টেন্ডার, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি উপস্থাপনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন সোহেল। বিনিময়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, সম্পত্তির দলিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

রিকশাচালক বাবার নামে ফ্ল্যাট ও গাড়ি
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মিরপুর-১৬ নম্বর সেকশনে ১ হাজার ৩৫৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট সংরক্ষিত প্রতিমন্ত্রী কোটায় সোহেল মিয়ার বাবা মো. ফজলুল হকের নামে বরাদ্দ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফজলুল হক দীর্ঘদিন রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার নামে রাজধানীর মিরপুরে সংরক্ষিত কোটায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি তাই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এছাড়া ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ফজলুল হকের নামে ১ হাজার ৫০০ সিসির একটি সাদা রঙের টয়োটা প্রাইভেট কার কেনা হয় বলে জানা গেছে। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ-২৯-১৩৬৫।

সোহেলের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, পরিবারের নামে এর বাইরে আরও একটি দামি গাড়ি রয়েছে। তবে এ তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

চাকরির এক বছরের মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এর মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভা থেকে ‘মেসার্স নেক্সাস এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে সোহেলের বাবা মো. ফজলুল হকের নাম রয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স নম্বর ০০৭৫১ এবং লাইসেন্স আইডি ০৫-০০৫-০০৭৫১। ফজলুল হকের টিআইএন নম্বর ৮৫২৮৫২৬২১৪৮৫ এবং প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ০০২২৩৪৯০৪-০৪০৬ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কালিহাতীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে নেক্সাস এন্টারপ্রাইজের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ টাকা ব্যালেন্স ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হওয়ার অভিযোগ
নেক্সাস এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদারি তালিকাভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনো উল্লেখযোগ্য পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এক্ষেত্রে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রভাব বিস্তারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কালিহাতীতে জমি, মার্কেট ও বিলাসবহুল বাড়ি
সোহেল মিয়ার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌর এলাকায়। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে তার পরিবারের নামে একাধিক সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হাসপাতাল রোডে সোনালী ব্যাংকের পাশে প্রায় ছয় শতাংশ জমি তার বাবা ফজলুল হকের নামে কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি। ওই জমিতে একটি মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মার্কেট নির্মাণে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ও অর্থের উৎস নির্ধারণে নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।

কালিহাতীর ফকিরবাড়ি রোডের কাছে সোহেলের ছোট ভাই আনোয়ারের জন্য একটি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

এর কাছেই ‘ফজলুল হক ভিলা’ নামে একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—হোল্ডিং-৩৮৫, রোড নম্বর-৫, সাতুটিয়া পূর্বপাড়া, কালিহাতী, টাঙ্গাইল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সোহেল সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার পরিবারের আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন স্থানে জমি কেনার পাশাপাশি বাবা, ভাই, শ্বশুর, সম্বন্ধী ও স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্ন
সোহেল মিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি কালিহাতী আরএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি, ২০০৬ সালে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেন।

এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারি-জুন সেশনে টাঙ্গাইলের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস মেয়াদি কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স এবং একই সময়ে বগুড়ার ইনস্টিটিউট অব আইসিটির অধীনে ছয় মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মাল্টিল্যাংগুয়াল সেক্রেটারিয়াল সায়েন্স কোর্স সম্পন্ন করার সনদ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে এসআইটি ফাউন্ডেশনের অফিস রেজিস্টারে সোহেল মিয়ার নামে সংশ্লিষ্ট সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। সনদে ব্যবহৃত স্বাক্ষরের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য সনদের স্বাক্ষরের মিল নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

একই সময়ে টাঙ্গাইল ও বগুড়ায় দুটি ছয় মাস মেয়াদি কোর্স করার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভর্তি রেজিস্টারেও তার নাম পাওয়া যায়নি। যদিও সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে তার মার্কশিট দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় সোহেল মিয়া যে শিক্ষাগত ও প্রশিক্ষণ সনদ ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলো আদৌ বৈধ ও প্রকৃত কি না।

তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মূল নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

ছয় বছরের মধ্যে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, এরপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।

এরপর ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে পদায়ন করা হয় বলে জানা গেছে।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান।

এর পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আরও জোরালো হয় বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

টেন্ডার, বদলি, প্লট-ফ্ল্যাট—সবখানেই কি প্রভাব?
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে উপদেষ্টার দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সোহেল মিয়া অবগত থাকতেন।

বিশেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন, রাজউকের প্লট ও ফ্ল্যাট-সংক্রান্ত বিষয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বড় অঙ্কের টেন্ডার, ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ফাইল নিয়ে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব কাজে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে সুবিধা আদায়ের একটি চক্র গড়ে উঠেছিল।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট ফাইল, সিদ্ধান্তের নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।

সরকারি বেতনের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে কি?
সোহেল মিয়া যখন সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তখন তার পদ ছিল সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর। ওই পদের বেতন স্কেল ছিল ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা।

প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চাকরির প্রথম কয়েক বছরে তার সরকারি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে মোট আয় আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে।

অন্যদিকে তার পরিবারের নামে মিরপুরের ফ্ল্যাট, গাড়ি, কালিহাতীতে জমি, মার্কেট ও বাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরির আয় দিয়ে এত অল্প সময়ে এসব সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে সম্পদের মালিকদের আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ক্রয়মূল্য, ঋণসংক্রান্ত নথি এবং অর্থের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।

সম্পদের মালিক বাবা-ভাই, নিয়ন্ত্রণ কার?
অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—সোহেল মিয়ার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ তার বাবা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে বলে অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ফজলুল হকের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে বর্তমানে তার নামে থাকা সম্পদের পরিমাণের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা প্রয়োজন।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা প্রশ্ন তুলেছেন—ফজলুল হকের আয় ও আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় এত সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠল?

তবে কেবল স্থানীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা বা অর্থের উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এজন্য আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল এবং সম্পদ ক্রয়ের অর্থের উৎস যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগের বিষয়ে সোহেলের বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. সোহেল মিয়ার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

সোহেল মিয়া বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
একজন সরকারি কর্মচারী কয়েক বছরের চাকরিতে কীভাবে তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুললেন, সেই সম্পদের অর্থের উৎস কী, সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিবারের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হলো এবং নিয়োগের সময় ব্যবহৃত শিক্ষাগত ও প্রশিক্ষণ সনদগুলো কতটা বৈধ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।

একই সঙ্গে টেন্ডার, বদলি, পদায়ন, প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এমন সময়ে একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—কীভাবে এবং কার সহায়তায় তার এমন উত্থান ঘটল?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—তার পরিবারের নামে থাকা বিপুল সম্পদের প্রকৃত মালিকানা কার এবং এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস কী?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।