চাকরির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজন ছিল ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতক ডিগ্রি। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতায় তৃতীয় শ্রেণি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনি লাল দাশ। তাঁর নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে।
বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মনি লাল দাশ সম্প্রতি অবসরে গেছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের এখনো সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হয়নি। গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কিছু নথি ও ফাইলের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিপিসির সহকারী ব্যবস্থাপক পদে আবেদনের জন্য ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতক ডিগ্রি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মনি লাল দাশের শিক্ষাগত ফলাফল ছিল তৃতীয় শ্রেণির। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করেও তিনি ১৯৯৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক (এমআইএস) হিসেবে বিপিসিতে যোগ দেন।
পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
চলতি বছরের ১৩ আগস্ট অবসর-পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার আগে দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু করা হয়। অনুসন্ধানে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়।
দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মনি লাল দাশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়সহ মোট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০৭ টাকা। এর বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ১৯৩ টাকা। ফলে ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৪ টাকার সম্পদের গ্রহণযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পেশায় গৃহিণী সেপিকা দাশ ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে নিবন্ধিত করদাতা হিসেবে সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ব্যবসা, কমিশন ব্যবসা ও মৎস্য চাষ থেকে আয়ের তথ্য দিয়ে আসছেন। তবে দুদকের অনুসন্ধানে কমিশন ব্যবসা বা মৎস্য চাষের কার্যক্রমের অস্তিত্ব এবং এ-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সেপিকা দাশের মোট অর্জিত সম্পদ ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২৭ টাকা উল্লেখ করে বলা হয়, এর মধ্যে ১ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার ২৫৫ টাকার আয়ের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।
দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ অনুসন্ধান শেষে মনি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিয়োগসংক্রান্ত নথি গায়েব এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মনি লাল দাশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২৪ সালে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মনি লাল দাশ। তখন তিনি দাবি করেছিলেন, একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে দুদককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।