বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। দীর্ঘ ১৭ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন, দমন-পীড়ন, গুম, খুন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যে গণজাগরণ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থানে—তার পেছনের নেপথ্য কারিগর হিসেবে যাঁর নাম বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
অনেকেই জানেন না, কিংবা পুরো চিত্রটি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন না—তারেক রহমান কেবল একজন নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতা নন; বরং তিনি ছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ ও সমন্বয়ক।
লন্ডনে নির্বাসন, কিন্তু রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে যাওয়ার পর তারেক রহমান ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু রাজনীতি থেকে তিনি কখনোই বিচ্ছিন্ন হননি। বরং লন্ডনে অবস্থানকালেই তিনি গড়ে তোলেন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, নাট্যকার, সাংবাদিক, কবি, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন বহু মানুষের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এসব যোগাযোগ কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ বা মতবিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক মনোভাব ও প্রশাসনিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা
২০১৩ সাল থেকে তারেক রহমান কেবল দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি জেলা, থানা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ বজায় রাখেন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন, নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানার ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একাধিক সূত্র জানায়, তারেক রহমান প্রতিদিন একাধিকবার বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কী ঘটছে, কোথায় আন্দোলন জোরালো হচ্ছে, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে—সেসব তথ্য সংগ্রহ করতেন। আন্দোলনের গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতেন।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের খবর
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল প্রশাসনের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রাখা। তিনি শুধু প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতেন না, বরং অনেক কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য নিজেরাই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
কে কোথায় বদলি হচ্ছেন, কোন কর্মকর্তা কী ধরনের ভূমিকা পালন করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ বা দ্বিধা কোথায়—এসব তথ্য তার কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্দোলনের সময় কোন জায়গায় কতটা চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব, কোথায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি কার্যকর হবে—এসব সিদ্ধান্তে এই তথ্যগুলো কাজে লাগানো হতো।
আন্দোলনের কৌশল: শুধু প্রতিবাদ নয়, পরিকল্পিত সংগ্রাম
তারেক রহমান আন্দোলনের খবর শুধু সংগ্রহ করতেন না; তিনি আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণেও সক্রিয় ছিলেন। কোন সমাবেশ কবে হবে, কোথায় হবে, তার আগে কীভাবে লিফলেট বিতরণ করা হবে, কোন বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি—এসব বিষয় ছিল তার নখদর্পণে।
আন্দোলনের ধরন কী হবে—শান্তিপূর্ণ, প্রতীকী, নাকি ধাপে ধাপে কঠোর কর্মসূচি—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে সাজানো হতো। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সুসংগঠিত কৌশলই দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।
১৭ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা
২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যে দমন-পীড়নের মুখে পড়ে, তার প্রেক্ষাপটে আন্দোলন টিকিয়ে রাখা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গুম, খুন, গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবরণ—এসবের মধ্য দিয়েও রাজনৈতিক কর্মীরা ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন।
এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে তারেক রহমানের নির্দেশনা ও রাজনৈতিক বার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বারবার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ধৈর্য, সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের কথা বলেন। তার কৌশল ছিল—আবেগ নয়, বরং ধারাবাহিক চাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলে দেওয়া।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান: নেপথ্যের বাস্তবতা
৫ আগস্টের আন্দোলনে তারেক রহমান সরাসরি মাঠে উপস্থিত ছিলেন না—এটি সত্য। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের একটি বড় অংশই জানেন, এই আন্দোলনের পেছনের পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় তারেক রহমানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ছাত্র নেতৃত্বের পাশাপাশি অন্য দলের ছাত্র, যুবক, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সাধারণ জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও তারেক রহমান সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী শ্রেণিকে এক ছাতার নিচে আনার কৌশলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলের ছাত্রনেতাদের মধ্যে কে কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন, কোন এলাকায় কীভাবে আন্দোলন জোরদার হবে—এসব নির্দেশনাও তারেক রহমান দিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩৬ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কিংবা ৫ আগস্টের সরকার পতন বা পালিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত আন্দোলনের ফলাফল, যার সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার সূচনায়, পরিকল্পনায় ও বাস্তবায়নে তারেক রহমান ছিলেন অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। তিনি হয়তো দৃশ্যমান মঞ্চে ছিলেন না, কিন্তু নেপথ্যে থেকে তিনি আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণ করেছেন।
ইতিহাসে তারেক রহমানের অবস্থান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক আন্দোলন এসেছে, অনেক নেতাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল ভিন্ন—তিনি ছিলেন নীরব কৌশলবিদ, যিনি দূরে থেকেও মাঠের প্রতিটি চাল পর্যবেক্ষণ করেছেন।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও তার আগের ১৭ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এই সংগ্রামের নেপথ্যের নায়ক হিসেবে তারেক রহমানের ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হবে।
রাজনীতির মঞ্চে তিনি প্রকাশ্যে থাকুন বা না থাকুন, শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে তারেক রহমান যে একটি কেন্দ্রীয় ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কমই রয়েছে।