বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মাঠে দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দুটি প্রধান নির্বাচনী জোট। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আরেকটি বৃহৎ জোট। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই জোটের মধ্যেই আগামী নির্বাচনের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে জোট গঠনের প্রক্রিয়া যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দুটি জোটের ভেতরেই আসন সমঝোতা ঘিরে বিভক্তি, সংশয় ও পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে।
দুটি জোট, ভিন্ন আদর্শ—একই সংকট
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটটি মূলত গড়ে উঠেছে অতীতে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত দলগুলোকে কেন্দ্র করে। গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত দলসমূহ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এনপিপিসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এই জোটের কাঠামো তৈরি হয়েছে। এই জোটের রাজনৈতিক বয়ান মূলত সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, নির্বাচনকালীন কাঠামো সংস্কার এবং ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য’-কে সামনে রেখে সাজানো হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এনসিপিসহ মোট ১১টি দল নিয়ে গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় নির্বাচনী জোট। এই জোটটি আদর্শিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হলেও নির্বাচনী কৌশলে তারা নিজেদের একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
দুটি জোটই ইতোমধ্যে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে মূল সংকট।
আসন সমঝোতা: প্রয়োজনীয় কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটভিত্তিক নির্বাচন নতুন নয়। বড় দলগুলো সাধারণত নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি মিত্রদের উপস্থিতিকে ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু আসন সমঝোতা মানেই ত্যাগ—আর এই ত্যাগ মেনে নিতে গিয়েই জোটের ভেতরে জন্ম নেয় অসন্তোষ।
বিএনপি ও জামায়াত—দুটি জোটের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তৃণমূল পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোন দল কতটি আসন পাবে, কোন এলাকায় কে প্রার্থী হবে—এই প্রশ্নগুলোই এখন দুই জোটের ভেতরে সবচেয়ে বড় অস্থিরতার কারণ।
বিএনপি জোটে বিদ্রোহের রাজনীতি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ঘিরে। জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া অনেক আসনেই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বা বহিষ্কৃত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। এতে একদিকে জোটের প্রার্থী দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসন সমঝোতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী তা মেনে নিতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনীতি করা নেতারা যখন দেখেন, বাইরের কোনো নেতা বা অন্য দল থেকে আসা কাউকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এই ক্ষোভ অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নিচ্ছে প্রকাশ্য বিদ্রোহে। ফলে একই রাজনৈতিক শিবিরের ভোট বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জামায়াত–ইসলামী আন্দোলন দ্বন্দ্ব
অন্য জোটে সংকটের ধরন ভিন্ন হলেও গভীরতা কম নয়। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। ইসলামী আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে জামায়াত ঐতিহ্যগতভাবে নিজেদের বৃহত্তর সংগঠন হিসেবে দেখে।
এই ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে টানাপোড়েন আসন সমঝোতার টেবিলে এসে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোন এলাকায় জামায়াত প্রার্থী দেবে, কোথায় ইসলামী আন্দোলন ছাড় পাবে—এই প্রশ্নগুলো নিয়ে দুই দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে জোটের ঐক্যই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তৃণমূল বনাম কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত
দুটি জোটের ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট—কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ও তৃণমূল বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনীতির শক্তির বড় অংশ এখনো তৃণমূলভিত্তিক। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন ছাড়া কোনো প্রার্থীকে জয়ী করা কঠিন।
কিন্তু আসন সমঝোতার সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রায়ই কৌশলগত হিসাবকে অগ্রাধিকার দেয়। এতে তৃণমূলের আবেগ, শ্রম ও প্রত্যাশা উপেক্ষিত হয়। এর ফলেই দেখা দেয় বিদ্রোহ, অসহযোগিতা কিংবা নীরব প্রতিরোধ।
অবিশ্বাসের রাজনীতি
জোট রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। ছোট দলগুলো আশঙ্কা করছে, বড় দলগুলো কেবল নির্বাচনী সুবিধার জন্য তাদের ব্যবহার করছে। আবার বড় দলগুলোর আশঙ্কা—ছোট দলগুলো প্রয়োজনীয় ভোট সরবরাহ করতে পারবে কি না।
এই অবিশ্বাস দুই জোটেই স্পষ্ট। বিএনপি জোটে শরিকরা শঙ্কিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর বিষয়ে। অন্যদিকে জামায়াত জোটে ছোট দলগুলো আশঙ্কা করছে, শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে তাদের কোণঠাসা করা হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি
সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দুই প্রধান জোটের লড়াই যতটা না প্রতিপক্ষের সঙ্গে, তার চেয়েও বেশি নিজেদের ভেতরের সংকট সামলানোর সঙ্গে। আসন সমঝোতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে দুই জোটই বড় রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত কোন জোট কতটা ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তৃণমূলকে কতটা সম্পৃক্ত করতে পারে এবং বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল হয়—সেটাই নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে।
এক কথায়, আগামী নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি হবে বাংলাদেশের জোট রাজনীতির সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার এক বড় পরীক্ষা।