ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৬ই জানুয়ারি ২০২৩ , বাংলা - 

রাজধানীসহ সারা দেশে শীতের তীব্রতা

স্টাফ রিপোর্টার ।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

2023-01-06
রাজধানীসহ সারা দেশে শীতের তীব্রতা

রাজধানীসহ সারা দেশে শীতের তীব্রতা বাড়ছেই। গতকালও ঢাকায় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। দুপুরের দিকে রোদের দেখা মিললেও  শীত কমেনি। এ ছাড়াও দেশের আট অঞ্চলের উপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। ঢাকার আবহাওয়া অধিদপ্তর এই তথ্য জানিয়েছে। গতকাল ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল কক্সবাজারের টেকনাফে ২৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় যশোরে। এদিকে তীব্র শীতের কারণে জনজীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ কষ্ট। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টের যেন অন্ত নেই। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমশীতল বাতাস। সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। গতকাল সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়, আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি বা ঘনকুয়াশা পড়তে পারে। এটি দেশের কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। 

 

রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মূলত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য কমে আসার কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। ঢাকার আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। দেশের আট অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। যেটি থাকতে পারে আরও কয়েকদিন। আগামী তিন দিনে দেশের আবহাওয়ায় সামান্য পরিবর্তন হতে পারে বলে জানান তিনি। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, উপমহাদেশীয় উচ্চ চাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তার কাছাকাছি বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। যার বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এদিকে খুলনা বিভাগ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। গতকাল এ বিভাগের দুই জেলা যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল। দুই দিন পর দুপুরের দিকে সূর্যের দেখা দিলেও কমেনি শীত। হাসপাতালগুলোতে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিড় বেড়েছে। 

 

এ ছাড়াও কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি, সাতক্ষীরায় ১১ দশমিক ২ ডিগ্রি, খুলনায় ১৩ ডিগ্রি, বাগেরহাটের মোংলায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতের তীব্রতা ভোগাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টের যেন শেষ নেই। হাড়ভাঙা শীতেও পেটের দায়ে বের হতে হচ্ছে। কেউ কেউ আক্রান্ত হচ্ছেন ঠাণ্ডাজনিত রোগে। ঢাকার তাপমাত্রায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহও অনুভূত হয়েছে। ঢাকায় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ। এমন পরিস্থিতি আরও দুই থেকে তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানায় আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঢাকার লালবাগের এক বাসিন্দা বলেন, গত তিন দিন ধরেই তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাতাস। রোদ দেখা যাচ্ছে না। দুপুরে একটু দেখা দিলেও বেশিক্ষণ ছিল না। 

 

মো. কামারুজ্জামান, দিনাজপুর থেকে জানান, “সূর্য উঠিছে কি-নাই বুঝাও যাছে না, তার উপর শির শির করি বাতাস বচ্ছে। একেলে হাড্ডিগুলাও কাঁপি যাতেছে। এই রকম জারত হাত-পা কোকড়া হয়া আইসেছে। গেল কয়দিনের থাকি আইজ একেলে বেজায় জার লাগছে। কামতও বাহির হবার পারছি না”। গতকাল সকালে তীব্র শীতে কাহিল হওয়ার এমন কথা জানাচ্ছিলেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার আজিমপুর গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক অনিল চন্দ্র রায়। শুধু অনিল রায়ই নয়, তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে এমন কথা জানাচ্ছিলেন অনেকেই। উত্তরের জেলা দিনাজপুরে কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনপদে রাস্তায় মানুষের চলাচল একবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে। কুয়াশার কারণে দিনের বেলাও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। 

 

খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে ছিন্নমূল মানুষ। আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দিনাজপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ৯৫ শতাংশ। চলতি সপ্তাহ ছাড়াও এই জেলার ওপর দিয়ে আরও দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে জানা গেছে। গতকাল প্রায় সারাদিনই সুর্য্যের দেখা না পাওয়ায় এবং দিনভর হিমেল বাতাসের কারণে অনুভূত হয় তীব্র শীত। কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে খেটে খাওয়া স্বল্প আয়ের মানুষ পড়ে বিপাকে।  অন্যদিকে দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার অসহায় ও শীতার্ত মানুষের মাঝে ৫৫ হাজার কম্বল বিতরণ করা হলেও এখন পর্যন্ত অনেক এলাকায় এগুলো পৌঁছেনি। এলাকার শীতার্ত মানুষকে শীতবস্ত্র বিতরণে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।  

 

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশা ও উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে সিরাজগঞ্জে জেঁকে বসেছে শীতের তীব্রতা। তিনদিনেও সূর্য্যের দেখা না মেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খেটে খাওয়া দিনমজুরসহ নিম্নআয়ের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত চরাঞ্চলের বাসিন্দারা শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা। ঘন কুয়াশার কারণে মহাসড়ক ও নৌ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সড়ক, মহাসড়কে বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যানগুলোকে হেডলাইন জ্বালিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলতে দেখা গেছে। গতকাল দুপুরে তাড়াশ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, নদী অববাহিকা অঞ্চলগুলোতে ঘন কুয়াশা পড়েছে। গতকাল জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি আরও বলেন, উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতিবেগ থাকবে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার। আগামী তিনদিনে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।

 

 দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য হ্রাসের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শীত অব্যাহত থাকতে পারে।  এদিকে, উত্তরের হিমেল হাওয়া ও শীতের তীব্রতা বাড়ায় জেলার নিম্নআয়ের মানুষজন পুরাতন কাপড়ের বাজারে ভিড় করছেন। শহরের নিউমার্কেট এলাকার পুরাতন কাপড়ের দোকানগুলোতে স্বল্পআয়ের মানুষের ভিড়। এতে করে বিক্রি বেড়েছে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। পুরাতন কাপড় কিনতে আসা রিকশাচালক সুজাব আলী (৬০) বলেন, কঠিন ঠাণ্ডা পড়েছে। এত ঠাণ্ডায় কাজ করতে পারি না। কনকনে শীতের কারণে সোয়েটার কেনার জন্য এসেছি। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় কিনতে পারছি না। শহরের নিউমার্কেট এলাকার পুরাতন কাপড়ের ব্যবসায়ী বাবু শেখ (২৫) বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনাবেচা বেড়েছে, দাম আগের মতোই আছে। কাওয়াকোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিয়া মুন্সী বলেন, সরকারি বরাদ্দের ৪৯০টি কম্বলসহ ব্যক্তিগত আরও ১০০ কম্বল শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মীর মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ৪৪ হাজার ১শ’ ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কম্বল জেলার ৭টি পৌরসভা ও ৮৩টি ইউনিয়নে ৪৯০টি করে শীত নিবারণের জন্য বিতরণ করা হয়েছে। আরও ২০ হাজার কম্বল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। কম্বলগুলো হাতে পেলে পর্যায়ক্রমে শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। 

 

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরে গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরোর বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধানের আবাদ। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যদি এইভাবে কুয়াশা ও তীব্র শীত থাকে, তাহলে মাঠের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নিধার্রণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ধানের আবাদ শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি বীজতলা রয়েছে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে।  ঘন কুয়াশার কারণে বুধবার রাত একটা থেকে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েছে হাজারো যাত্রী। তবে ঘন কুয়াশা কেটে গেলে সকাল ৮টার দিকে ফেরি চলাচল শুরু হয় বলে জানিয়েছেন বিআইডাব্লিউটিএ’র ম্যানেজার মো. কাউছার। তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঘন কুয়াশা কেটে গেলে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। এখন ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

 

 গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীতে লক্ষ্মীপুরে দুর্ভোগ বেড়েছে জনজীবনে। তারসঙ্গে কনকনে হিমেল ঠাণ্ডা বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছে জেলার সাধারণ মানুষজন। ঘন কুয়াশার কারণে লাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। গরম কাপড়ের অভাবে কাজে যেতে পারছে না শ্রমজীবি মানুষেরা। চরম শীতে কষ্টে ভুগছে শিশু ও বৃদ্ধরা। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন উপকূলীয় এলাকার নিম্নআয়ের মানুষেরা। এদিকে শীতার্তেদের মাঝে সরকারিভাবে এখনো কম্বল বিতরণ করা হয়নি। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষে সামান্য কিছু মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। অপরদিকে ঠাণ্ডায় বাড়ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগ-বালাই। গত এক সপ্তাহে সদর হাসপাতালেই ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ৪ শতাধিক রোগী। তবে এর মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। একই অবস্থা রায়পুর, রামগতি, কমলনগর ও রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। 

 

সেখানেও বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা। সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মরিয়ম বেগমের মা সাবিনা ইয়াছমিন জানান, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু বেড পাচ্ছি না। প্রতি বেডে দুই থেকে ৩টি বাচ্চা চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে করে আরও দুর্ভোগ বাড়ছে কয়েকগুণ। লক্ষ্মীপুর স্টার কেএস হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজির ইসলাম রবিন জানান, ইতিমধ্যে হাসপাপাতালে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগ বেড়েই চলছে। শিশুদেরকে গরম খাবার খেতে হবে। বিশেষ করে বাইরের খাবার যেন না খায় সেদিকে নজর দিতে হবে। সবসময় গরম কাপড়চোপড় দিয়ে রাখতে হবে। কোনোভাবে যেন ঠাণ্ডা না লাগে। সেটা খেয়াল রাখতে হবে। সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আনোয়ার হোসেন জানান, তীব্র শীতে হাসপাতালের রোগীর চাপ বাড়ছে। 

 

কোনো আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঔষধ রয়েছে। সবসময় মনিটরিং করা হচ্ছে। আরও কয়েকদিন রোগীর চাপ থাকবে বলেও জানান তিনি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন জানান. ঘন কুয়াশা ও শীতের প্রভাবে কিছু বীজতলা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি বীজতলা যেন নষ্ট না হয় সে বিষযে কৃষকদের নানা পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যেন প্রতিদিন সন্ধ্যায় বীজতলায় পানি দেয়। সকালে ওই পানি বীজতলা থেকে নামিয়ে দিলেও বীজতলার আর ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না।  

 

ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি জানান, আনোয়ারের মা আনোয়া থাকেন রেললাইনের ধারে ছোট ঝুপড়ি ঘরে-সঙ্গে রয়েছে তার আদরের নাতি। সকাল থেকে রাত অবধি ভিক্ষা করে, যা পান তা দিয়েই চলে যায় তার সংসার। তবে গত ৩ দিনের হাড় কাঁপানো শীতে সে বাইরে বের হতে পারেনি। কোনোমতে মুড়ি খেয়ে রাত্রিযাপন করতে হচ্ছে তাকে। আনোয়ারা বেগম জানান, এই শীতে মরার মতো অবস্থা হয়েছে আমার। ঘরে গরম কাপড় নাই। সারারাত ভাঙ্গা ঘর দিয়ে বাতাস ঢুকে ঠাণ্ডার পরিমাণ প্রায় শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে বিছানায় বসেই রাত কাটাতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে সহযোগিতা করেননি।  শুধু আনোয়ারা নয় গত কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা আর শীতল হাওয়ার কারণে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। রাত ৯টার পর থেকে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঘন কুয়াশার কারণে রাত থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো পানি পড়তে থাকে। বইছে হিমেল হাওয়া। শীত মোকাবিলায় মানুষজন অস্থির হয়ে পড়েছে। শীতবস্ত্রের অভাবে কাহিল হয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

 

 শীতের কারণে গরিব মানুষজন গরম কাপড়ের অভাবে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করছে। শীত থেকে বাঁচতে মানুষজন খড়কুটা জ্বালিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট নয়। হাড় কাঁপানো শীতের তীব্রতায় অসহায় হয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। গরম কাপড়ের আশায় মানুষজন ছুটছে গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে। ঘন কুয়াশার কারণে বাস-ট্রাককে দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। রাত যত গভীর হচ্ছে কুয়াশার পরিমাণ ততই বাড়ছে। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতের তীব্রতা। শীত বাড়ার কারণে বেড়ে গেছে রেললাইনের ধারে গরমের কাপড়ের বিক্রি। সকাল থেকে রাত অবধি মানুষজন ক্রয় করছেন গরম কাপড়। গতবারের চেয়ে এবার বিক্রি অনেকটা কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি অনেকটা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন দোকানদার শাহীন। সীমান্তঘেঁষা নীলফামারীর ডোমারে শীতের প্রকোপ বেশি থাকলেও এবার তীব্রতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ঝুপড়ি ঘরে থাকা পরিবারগুলো। রেললাইনের ধারে ঝুপড়ি ঘরে থাকা পরিবারগুলো জানিয়েছে শীতের তীব্রতার কারণে সারারাত আগুন জ্বালিয়ে তাদের শীত মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ছায়াপাড়া এলাকার রকি জানান, শীতে গরম কাপড় না থাকায় কষ্ট করে রাত্রিযাপন করতে হচ্ছে। শীতের কারণে কাজে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। সুফিয়া বেগম নামে এক মহিলা জানান, ‘জারোত হামরা কোনো কাম করবার না পারি। জারোত হামরা মরি গেলেও কাহো হামার খবর নেয় নাই।’ 

 

স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা পার হয়ে গেলেও দেখা মেলেনি সূর্যের। সূর্যের কিরণ না থাকায় এবং উত্তরমুখী বাতাসের কারণে চরম শীতের প্রকোপ বেড়েছে। শীতের দাপটে কুপোকাত হয়ে পড়েছে খুলনাঞ্চলের মানুষ। সকাল-দুপুর গড়িয়ে গেলে সর্বত্র সড়ক, যানবাহন, অফিস-আদালত, বিভিন্নস্থানে শীতের মোটা কাপড়ে চলাচল করতে দেখা সর্বসাধারণকে। বাড়িতে বাড়িতে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে খুব একটা বাসাবাড়ি হতে বের হচ্ছে না অভিভাবকেরা। এ সময় দেশের অনেক স্থানে বয়স্করা শীত সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করে। 

 

শীতের দাপটে বাইরের কনকনে ঠাণ্ডায় চারিদিকে কাঁপছে।  নগরীর ডাকবাংলো, শিববাড়ী মোড়, সোনাডাঙ্গা, ময়লাপোতা, নিরালা, গল্লামারী, বয়রা, বৈকালি, খালিশপুর, দৌলতপুর, রেলিগেট, মানিকতলা, ফুলবাড়ী, শিরোমনি, ফুলতলাসহ স্থানীয় এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখা গেছে সব বয়সের মানুষ শীতের কবলে পড়ে কুপোকাত। ওই সকল এলাকার রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, পথচারী, সাধারণ পেশাজীবী মানুষসহ সর্বস্তরের মানুষ শীতের কবলে পড়ে চরম দুর্ভোগ পড়েছে। কোথাও কোথাও শীতের প্রকোপ হতে মুক্তি পেতে অনেকে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালিয়েছে।  হঠাৎ এমন শীতের প্রকোপে পুরাতন শীতের কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। খুলনা ফেরীঘাট, রেলওয়ে সুপার মার্কেট, জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন, দৌলতপুর, খালিশপুর, ফুলবাড়ী, শিরোমনিসহ স্থানীয় এলাকার ভ্রাম্যমাণ পুরাতন শীতের কাপড়ের দোকানে সব বয়সী মানুষ ভিড় জমিয়েছে। ওইসব দোকানগুলোতে শিশুদের পোশাক, জ্যাকেট, সোয়েটার, মোজা, টুপিসহ বিভিন্ন প্রকার পোশাক সরবরাহ করছে সর্বশ্রেণির মানুষ। দিনমজুর নজরুল ইসলাম জানান, পাইকারী কাঁচাবাজারে ট্রাক হতে বস্তা নামায়। ভোর ৪টার দিকে বাজারে যেতে হয়। 

 

গতকাল ভোরে বাইরে প্রচুর কুয়াশা পড়েছে। তাছাড়া বাতাসও বেশি। দিনের আলো ফুটলেও দুপুর গড়িয়ে গেলেও সূর্যের মুখ দেখা মেলেনি। অন্যদিনের তুলনায় কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ জানান, সূর্যের কিরণ নেই, উত্তরমুখী বাতাস বইছে, যে কারণে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা কমছে পারে, ক্রমান্বয়ে আরও কমতে পারে, বাড়বে কুয়াশাও। সামনে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। 

 

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা।অন্যান্য রোগীর তুলনায় ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপে শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে ফেনীর হাসপাতালগুলোতে। এতে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত বিছানায় জায়গা না পাওয়ায় অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছে মেঝেতে। ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৭ দিনে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৭ বেডের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে প্রতিদিন শতাধিত রোগী। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছে দুই শতাধিকেরও বেশি শিশু। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা এসব শিশুর অধিকাংশই নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ড ও মেডিসিন ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগী গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে। 

 

রোগীর চাপে হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতর মেঝেতেও ফোম দিয়ে বাড়ানো হয়েছে শয্যা।  হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নেওয়া দেড়মাস বয়সী শিশু ফারিয়া সুলতানার মা মর্জিনা আক্তার জানান, ৫ দিন আগে ফারিয়ার জ্বর ও ঠান্ডা দেখা দেয়। স্থানীয় চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে কোনো কাজ হয়নি। তাই নিরুপায় হয়ে মেয়েকে নিয়ে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। শয্যা না থাকায় বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এছাড়া বারান্দায় রোগীদের চাপে নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ ইকবাল জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শীত যত বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব রোগ থেকে রক্ষা পেতে শিশুদের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত নিয়মিত বুকের দুধ পান করাতে পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখতে শিশুর মায়েদের প্রতি পরামর্শ দেন তিনি।