এক সময় রাজধানীর টিকাটুলিতে অবস্থিত শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় ছিল নারী শিক্ষার অন্যতম আস্থার কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বহু শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সমাজে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রশাসনিক জটিলতা, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, এক সময় যে প্রতিষ্ঠানটি শৃঙ্খলা, সুনাম ও শিক্ষার মানের জন্য পরিচিত ছিল, বর্তমানে সেখানে নানা সংকট বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সম্প্রতি অধ্যক্ষের কক্ষ ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
এ ছাড়া অতীতে প্রতিষ্ঠানের দুইজন অধ্যক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একজন অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকি এবং অপর একজন অধ্যক্ষকে যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ডিংও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত বা আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক পরিবেশকেই অস্থিতিশীল করে না, বরং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও বিভিন্ন পক্ষের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনামও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা বন্ধ করে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। তারা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সকল অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির হারানো গৌরব ও সুশাসন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি জটিলতা সামনে আসে। শিক্ষা অধিদপ্তরের আপত্তির পর নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সকলকে বিধি মোতাবেক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বলা হয়। সে সময় মোট ১৪ জন শিক্ষক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন।
অভিযোগ রয়েছে, যেসব ব্যক্তি পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং পরবর্তীতে শিক্ষক পদে বহাল থাকতে পারেননি, তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টি করে আসছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, অতীতে তারা তৎকালীন সভাপতিকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দিয়েছিলেন। বর্তমানে তারাই আবার প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নতুন পরিচালনা কমিটি গঠনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, একজন রাজনৈতিক নেতার সমর্থিত কয়েকজন ব্যক্তি কার্যত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি একটি মহিলা বিদ্যালয় ও কলেজ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বহিরাগতদের নিয়মিত আনাগোনা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন সাবেক শিক্ষক ও বহিরাগত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে অধ্যক্ষের কক্ষের তালা ভেঙে ফেলেন। তখন প্রতিষ্ঠানে একজন বৈধভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি েএদিন অনুপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোকে অকার্যকর করে নিজেদের পছন্দের একজনকে অধ্যক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যার নিয়োগটিই কলেজে অবৈধভাবে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে । তারা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির প্রভাব খাটিয়ে কয়েকজন শিক্ষককে যথাযথ নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণেই পরবর্তীতে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে আপত্তি আসে এবং বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সেই সময় যদি যথাযথভাবে অনিয়মের বিচার হতো, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত।
কলেজ শাখার এক শিক্ষক রোজিনা শাহিনকে নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, তৎকালীন কমিটির এক আত্মীয়ের প্রভাবের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শিক্ষকরা আরও অভিযোগ করেন, নতুন সভাপতি একজন শিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তি হলেও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত নন। তাদের দাবি, কিছু রাজনৈতিক অনুসারী তার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে প্রকৃত সমস্যাগুলো সভাপতির নজরে আসছে না।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ রাসেল মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রতিষ্ঠানের সাবেক দুইজন অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অনেক সিদ্ধান্তে সভাপতির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। বরং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করছে বলে তাদের ধারণা।
এদিকে কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধ চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ, প্রশাসনিক অনিয়ম, ভাঙচুরের ঘটনা এবং বহিরাগতদের হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু চলমান সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও শিক্ষা কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ না করলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব ও শিক্ষার পরিবেশ আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।