ঢাকা, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১০:২৬:৫৬ PM

নারী উদ্যোক্তাবান্ধব বাজেট এখন সময়ের দাবি

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
08-06-2026 10:26:56 PM
নারী উদ্যোক্তাবান্ধব  বাজেট এখন সময়ের দাবি

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা বর্তমানে পুরুষের তুলনায় সামান্য বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ৯৬ দশমিক ৩৩। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশই নারী। তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, সেবা খাত এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীদের অবদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তবে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানায় নারীদের উপস্থিতি এখনও অত্যন্ত সীমিত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নারীদের মালিকানা অংশীদারত্ব রয়েছে, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড়ের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ২৮ লাখ নারী-নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) রয়েছে, যা মোট এসএমই খাতের প্রায় ২৫ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবুও দেশের নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ নারীদের মালিকানাধীন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীবান্ধব নীতির ঘাটতি, পুরুষকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো, অর্থায়নে সীমিত প্রবেশাধিকার, সম্পত্তির মালিকানার অভাব, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বাধা নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। তাই আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সত্যিকার অর্থে নারী উদ্যোক্তাবান্ধব করতে হলে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, অর্থায়ন ও নীতিগত কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।

এ বিষয়ে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রুপালী চৌধুরী বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা থাকলেও বাস্তবে জামানতের শর্তই সবচেয়ে বড় বাধা। অধিকাংশ নারীর নামে সম্পত্তি না থাকায় ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে নীতিগত সুবিধা থাকলেও অনেক নারী উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হন।

তার মতে, শুধু বাজেটে বরাদ্দ রাখলেই হবে না; এমন একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্ভাবনা, লেনদেনের ইতিহাস এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করা হবে। তিনি আরও বলেন, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও স্টার্টআপ অর্থায়নের মতো বিকল্প মডেল অনুসরণ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং রপ্তানিমুখী খাতে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান মনে করেন, নারীদের জন্য বিদ্যমান অনেক অর্থায়ন স্কিম এখনও পুরুষ সদস্যের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, একজন নারী যদি ঋণ পাওয়ার জন্য স্বামী, ভাই কিংবা অন্য কোনো পুরুষ সদস্যের গ্যারান্টির ওপর নির্ভর করেন, তাহলে সেটিকে প্রকৃত নারী ক্ষমতায়ন বলা যায় না।

তার মতে, নারীদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, পুরুষ গ্যারান্টারবিহীন অর্থায়ন এবং ব্যবসার সম্পদকে জামানত হিসেবে গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তিনি বলেন, একজন নারী উদ্যোক্তার ব্যবসার অর্ডার, নগদ প্রবাহ, যন্ত্রপাতি কিংবা ব্যবসার সম্ভাবনাকে মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। শুধুমাত্র পৈতৃক সম্পত্তি বা জমি না থাকায় একজন উদ্যোক্তা কেন ঋণ পাবেন না—এ প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান দৃশ্যমান হলেও ব্যবসার মালিকানায় তারা এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারী উদ্যোক্তারা পুরুষদের তুলনায় কম অর্থায়ন পান এবং ঋণের শর্তও তুলনামূলকভাবে কঠোর হয়। বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান।

অনেক নারী উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাব থাকলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকিং ইতিহাস নেই। পাশাপাশি সম্পত্তির মালিকানা পুরুষদের হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত থাকায় নারীরা ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় জামানত দেখাতে পারেন না। ফলে তাদের ব্যবসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অর্থায়নপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার-সমর্থিত ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা প্রয়োজন। এতে জামানত না থাকলেও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পেতে পারবেন এবং ঋণের ঝুঁকির একটি অংশ সরকার বহন করবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জামানতমুক্ত ঋণের যে সীমা রয়েছে, তা ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কোল্যাটারেল-ফ্রি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করলে নারীরা সহজেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাবে এবং উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।

ব্যবসায়ী নেতারা নারী পরিচালিত নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর অবকাশ, সহজ ভ্যাট নিবন্ধন এবং কর রিটার্ন দাখিলে বিশেষ সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন। রুপালী চৌধুরীর মতে, বর্তমানে ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্য, যা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরও বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নারীরা নানা ধরনের অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। তাই নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ করহার ও কর-প্রণোদনা চালু করা প্রয়োজন।

এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের সরকারি ক্রয় কার্যক্রম ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সরকারি ক্রয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষণ করা হলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাজার তৈরি হবে এবং তারা ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আগামী জাতীয় বাজেটে যদি জামানতমুক্ত ঋণ, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম, কর-সুবিধা, সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার, নারী স্টার্টআপ তহবিল এবং নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন।