ঢাকা, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
সময়: ০৬:৪২:২০ PM

ত্যাগ, সংগ্রাম ও আনুগত্যের প্রতিচ্ছবি:রুহুল কবির রিজভী

মান্নান মারুফ
08-06-2026 06:42:20 PM
ত্যাগ, সংগ্রাম ও আনুগত্যের প্রতিচ্ছবি:রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা আছেন, যাদের পরিচয় পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার অলংকারে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন সহ্য করার মানসিকতা এবং দলের প্রতি অবিচল আনুগত্যই তাদের প্রকৃত পরিচয়। রুহুল কবির রিজভী তেমনই একজন নেতা, যাকে অনেক বিএনপি নেতাকর্মী দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনও মন্ত্রী হননি, জাতীয় সংসদের সদস্যও হননি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করার সুযোগও তার ভাগ্যে খুব একটা জোটেনি। কিন্তু দলের সংকট, আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় যে কয়েকজন নেতাকে সবসময় সামনের সারিতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে রিজভী অন্যতম।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি বামপন্থী বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা হিসেবে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেই আঘাতের শারীরিক প্রভাব এখনও তাকে ভোগাতে পারে বলে অনেকেই দাবি করেন। আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, মামলা এবং কারাবাস তার রাজনৈতিক জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনৈতিক সংকটময় সময়ে তাকে দলের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে দেখা গেছে। রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রায় প্রতিদিনই তিনি সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। অনেক নেতাকর্মীর মতে, যখন দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা মামলা, কারাবাস বা নির্বাসিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন, তখন রিজভী মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর দুঃসময়ে তার ভূমিকা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে যখন অনেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন, তখনও রিজভী দলীয় কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। মামলার হাজিরা, আদালত, থানা ও কারাগারের মধ্যেই তার জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে বলে সমর্থকরা উল্লেখ করেন।

রিজভীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করে। তারা মনে করেন, তিনি ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বা ক্ষমতার মোহের চেয়ে দলীয় দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দলের জন্য অর্থ সংগ্রহ, সাংগঠনিক ব্যয় মেটানো এবং কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কর্মরত অনেকের সঙ্গে একই পরিবেশে খাবার খাওয়া, সাধারণ জীবনযাপন এবং কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়গুলোও তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ কারণেই তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী তাকে কেবল একজন নেতা নয়, বরং একজন অভিভাবক হিসেবেও দেখেন।

দলের প্রতি তার আনুগত্যের বিষয়টিও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। দীর্ঘ সংগ্রামের পরও তিনি কখনও প্রকাশ্যে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। বরং দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান-এর আদর্শ, খালেদা জিয়া-র নেতৃত্ব এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর রাজনৈতিক নির্দেশনা বাস্তবায়নে তিনি নিবেদিতপ্রাণ বলে তার অনুসারীরা মনে করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক নেতা ক্ষমতা পেয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, সংসদ সদস্য হয়েছেন; কিন্তু কিছু নেতা আছেন যাদের অবদান পরিমাপ করা হয় তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সংগ্রামের ইতিহাস দিয়ে। রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির একটি বড় অংশ সেই শ্রেণির নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করে।

বর্তমানে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে দলের অন্যতম মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই তাকে সাংগঠনিক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি বলে তার সহকর্মীরা মনে করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্যাগ ও সংগ্রামের বহু কাহিনি রয়েছে। সেই ইতিহাসে রুহুল কবির রিজভীর নামটি অনেকের কাছে এক অবিচল কর্মীর প্রতীক—যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে হাল ধরেছিলেন। ক্ষমতা, পদ বা ব্যক্তিগত প্রাপ্তির হিসাবের চেয়ে দলের অস্তিত্ব রক্ষা এবং কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোকে যিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে তার অনুসারীরা বিশ্বাস করেন।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। একজন নেতাকে নিয়ে মূল্যায়নও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সমর্থকদের দৃষ্টিতে রুহুল কবির রিজভী এমন একজন রাজনীতিক, যার দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবরণ, সাংগঠনিক নিষ্ঠা এবং দলের প্রতি অটুট আনুগত্য তাকে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে। তাদের কাছে তিনি কেবল একজন নেতা নন; বরং ত্যাগ, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের এক জীবন্ত প্রতীক।