ঢাকা, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
সময়: ০৪:০৫:৪০ PM

শামসুজ্জামান দুদুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প

মান্নান মারুফ
08-06-2026 04:05:40 PM
শামসুজ্জামান দুদুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা আছেন, যাদের পরিচয় কেবল পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের জীবনই হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক ইতিহাস। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু তেমনই একজন নেতা। প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক জীবনে তিনি ক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন আদর্শ, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক সংগ্রামকে। অসংখ্য মামলা, জেল-জুলুম, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর রাজনৈতিক জীবন আজও বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

“বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও চৌকস রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী এই নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ছিল তাঁর রাজনৈতিক পথচলার মূল প্রেরণা। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, ভালোবাসা ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা তাঁকে দলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শামসুজ্জামান দুদু কখনোই সহজ পথ পাননি। বিশেষ করে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে তাঁকে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জেল-জুলুম, মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানি তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং বিরোধী মত প্রকাশের কারণে বারবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো চাপ, ভয় বা লোভ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে টলাতে পারেনি।

রাজনীতির কারণে জীবনের প্রায় ৪৬টি বছর কেটেছে অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে। সাধারণ মানুষের মতো পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে সময় কাটানো, শান্তিতে ঘুমানো কিংবা ব্যক্তিগত আরামের জীবন খুব কমই পেয়েছেন তিনি। তবুও দলের আদর্শ ও গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস তাঁকে কখনো পিছু হটতে দেয়নি।

দুইবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটানোর সুযোগ পেলেও দলীয় দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেই আরামও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে রাজনৈতিক দায়িত্বই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।দলের কর্মকান্ড নিয়েই তার সময় কাটতো।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামল ছিল বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়। সেই সময় শামসুজ্জামান দুদুর জীবনও ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কখনো আদালতে হাজিরা, কখনো আত্মগোপন, আবার কখনো কারাগারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর মতো তিনিও ছিলেন অবিরাম চাপ ও হয়রানির মুখে। আদালত প্রাঙ্গণ, কারাগার কিংবা পুলিশের হেফাজত—এগুলোই যেন হয়ে উঠেছিল বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের জীবনের অংশ।

দুদু বলেন, সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা প্রকাশ করারও সুযোগ ছিল না। কারণ বিএনপির প্রায় প্রতিটি নেতা-কর্মীই তখন একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কেউ আদালতে, কেউ কারাগারে, কেউবা আত্মগোপনে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দলের নেতাকর্মীরা এক ধরনের অঘোষিত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছেন।

তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। দলের নেত্রী ও নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থা ও ভালোবাসা একটুও কমেনি। বরং প্রতিটি সংকট তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

বর্তমানে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও শামসুজ্জামান দুদু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি। মন্ত্রীও হননি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর কণ্ঠে নেই কোনো হতাশা, নেই কোনো আক্ষেপ। সম্প্রতি এক আড্ডায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, তা উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

দুদু বলেন, “বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এই দলের জন্য অসংখ্য নেতা-কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন। অনেকেই আজ পৃথিবীতে নেই। তারা তো দল করে কোনো পদ-পদবি কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা পাননি। আমি তো অন্তত বেঁচে আছি। দল আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে, স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি, এটিই কি আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নয়?”তাঁর এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে একজন আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীর মানসিকতা। যেখানে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে দলের অর্জনকেই বড় করে দেখা হয়।

মনোনয়ন না পাওয়া কিংবা মন্ত্রী না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দলের অনেক কাজ থাকে। দল যাকে যেখানে প্রয়োজন মনে করবে, সেখানেই দায়িত্ব দেবে। বিএনপি এভাবেই চলে। এখানে পদ না পেলেই ক্ষোভ বা কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। দল যদি মনে করে আমাকে কোনো দায়িত্বে প্রয়োজন, তখনই সেই দায়িত্ব দেবে।”

ক্ষমতা ও অর্থের মোহ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিও স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের সেবা এবং আদর্শের চর্চা। ক্ষমতার লোভ নিয়ে রাজনীতি করলে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, “ক্ষমতার লোভ থাকলে রাজনীতি করা উচিত নয়। অর্থ ও ক্ষমতার লোভ মানুষকে বিপদগামী করে এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে।”

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শামসুজ্জামান দুদু শুধু ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবেই নয়, বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিএনপির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনীতিতে তাঁর পথচলা মূলত ত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শের এক দীর্ঘ অধ্যায়। বর্তমান সময়ে যখন রাজনীতিকে অনেকেই ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে, তখন শামসুজ্জামান দুদুর মতো নেতারা ভিন্ন এক উদাহরণ স্থাপন করেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতির আসল শক্তি পদ-পদবি নয়, বরং বিশ্বাস, ত্যাগ ও আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শামসুজ্জামান দুদুর নাম হয়তো সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি নয়, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, দলের প্রতি অটুট নিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করার মানসিকতা তাঁকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় অর্জন মন্ত্রী হওয়া নয়, বরং নিজের বিশ্বাসকে অটুট রেখে সংগ্রামের পথে অবিচল থাকা।আর সেই কারণেই শামসুজ্জামান দুদুর রাজনৈতিক জীবন শুধুমাত্র একজন নেতার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ত্যাগ এবং আদর্শিক রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল।