ঢাকা, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৫:৩৫ PM

বিজেপির জয়ে ভোটার বাদ পড়ার ছায়া

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
07-05-2026 08:35:17 PM
বিজেপির জয়ে ভোটার বাদ পড়ার ছায়া

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর (Special Intensive Revision) নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, বিজেপির জেতা বহু আসনে দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে এই প্রক্রিয়া কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা চলছে।

নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ছয় মাস ধরে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার কাজ পরিচালনা করা হয়। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কার্যক্রমে মোট প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এটি রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের আবেদন ও আপত্তি এখনো ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। অন্যদিকে বিজেপি এই সংশোধনী কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে সমর্থন জানায়।

নির্বাচন-পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপি যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ১০৫টি আসনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিতেই অতীতে কখনো জয় পায়নি বিজেপি। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে বহু আসনের নির্বাচনী সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে বিরোধী দলগুলোর ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকে প্রভাব পড়েছে কি না, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ অনেক আসনেই বিজয়ী প্রার্থীর ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম, কিন্তু বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল কয়েক গুণ বেশি।

বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস বিধানসভা আসনকে এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় নয় হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ওই আসন থেকে ৭ হাজার ৫১৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ে। পরবর্তীতে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে আসনটি জিতে নেয়। ফলে বিরোধী দলগুলোর দাবি, বাদ পড়া ভোটারদের বড় অংশ ভোট দিতে পারলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর আসনেও। দীর্ঘদিন ধরে বাম দল ও তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রে সংশোধনী প্রক্রিয়ায় ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ যায়। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিজেপি প্রায় ২৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এত বড় সংখ্যক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর কেন্দ্রে। এই আসন থেকে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে প্রায় ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাজিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভবানীপুর বরাবরই তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ফলে এই ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

শুধু মুখ্যমন্ত্রীই নন, তৃণমূল সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। টানা দুই দশক ধরে টালিগঞ্জ আসনে জয়ী হওয়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবার ৬ হাজার ১৩ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। অথচ এই কেন্দ্রেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে ৩৭ হাজার ৮৮৯ জনের নাম। একইভাবে শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশীষ চক্রবর্তীর মতো প্রভাবশালী নেতাদের আসনেও বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা তাদের পরাজয়ের ব্যবধানের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

কলকাতাভিত্তিক পাবলিক পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে বহু আসনে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। যদিও এই দাবির বিষয়ে এখনো নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন ছিল নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এতে ভুয়া বা একাধিক নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনে জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে বলেই বিজেপি এত বড় জয় পেয়েছে। পাশাপাশি তারা দাবি করছে, সরকারবিরোধী মনোভাব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তিও নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দল বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বহু বৈধ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। তারা বিষয়টি নিয়ে আদালত ও নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানানোসহ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একইসঙ্গে এটি নিশ্চিত করাও জরুরি যে কোনো বৈধ ভোটার যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে যেসব আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজয়ী ব্যবধানের চেয়ে বেশি, সেসব ক্ষেত্রে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয় যেমন রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে, তেমনি ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাদ পড়া বিপুলসংখ্যক ভোটার নির্বাচনের ফলাফল কতটা প্রভাবিত করেছে, তা হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনায় আরও স্পষ্ট হবে। তবে এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।