ঢাকা, শনিবার, ৯ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:২৮:৪৭ PM

নগদে শতকোটির ব্যবসা ডাক বিভাগের কর্তার

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
16-04-2026 09:27:33 PM
নগদে শতকোটির ব্যবসা ডাক বিভাগের কর্তার

ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) জাকির হাসান নূরের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরোক্ষভাবে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি একদিকে নগদ-সংক্রান্ত সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন, অন্যদিকে তাঁর মামাতো ভাই মোহাম্মদ তারিকুজ্জামানের নামে নগদের ‘মানি ডিস্ট্রিবিউটর’ ব্যবসা পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ব্যবসায় মাসিক লেনদেন ২০০ কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গেছে।

মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ শুরু থেকেই ডাক বিভাগের সেবা হিসেবে পরিচিত হলেও এর মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেড। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতিষ্ঠানকে ডাক বিভাগের পরিচয়ে এমএফএস খাতে যুক্ত করার পেছনে জাকির হাসান নূর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নেপথ্যে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠান নিয়ে নগদের কার্যক্রম শুরু হয়। এর একটি ছিল ‘এম আর কর্পোরেশন’, যার কর্ণধার মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান। তাঁর পেশাগত জীবনে পূর্বে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও তিনি এই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ লাভ করেন। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি জাকির হাসান নূরের মামাতো ভাই।

সময়ের সঙ্গে জাকিরের পদোন্নতির পাশাপাশি তারিকুজ্জামানের ব্যবসাও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে ঢাকা উত্তর অঞ্চলে নগদের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। তদন্তে উঠে এসেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসে ২০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এ থেকে কমিশন হিসেবে প্রায় ২৫ লাখ টাকা এবং সব খরচ বাদে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসিক আয় হয়েছে বলে জানা যায়।

২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জাকির নগদ-সংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, চুক্তি স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ডাক বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি নগদের কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন। তবে এই সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি কোথাও প্রকাশ করেননি, যা স্বার্থের সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২০২৫ সালের ১৪ জুন উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে নগদের এক এজেন্টের কাছ থেকে এক কোটি আট লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা এই পুরো বিষয়টিকে নতুনভাবে সামনে আনে। ওই এজেন্টের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন তারিকুজ্জামান। ঘটনার পর দায়ের করা জিডি ও মামলার নথিতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঠিকানা জাকিরের নিজস্ব বাসভবনের সঙ্গে মিলে যায়, যা সন্দেহ আরও বাড়ায়।

এছাড়া তারিকুজ্জামানের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও নানা অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। আবেদন করার একদিনের মধ্যেই অনুমোদন পাওয়া, একাধিক প্রতিষ্ঠানের একই ঠিকানা ব্যবহার, ভিন্ন পোস্টকোড উল্লেখ, এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানে একই ই-টিন নম্বর ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব অনিয়ম কর ফাঁকির সম্ভাবনাও তৈরি করে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পদ ব্যবহার করে আত্মীয়ের ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করেন, তবে তা গুরুতর অনিয়ম এবং তদন্তযোগ্য অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।

অভিযোগের বিষয়ে জাকির হাসান নূর দাবি করেছেন, তাঁর মামাতো ভাই স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং এতে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি বলেন, শুরুতে কিছুদিন ব্যবসার ঠিকানা তাঁর বাসায় থাকলেও বর্তমানে তা নেই এবং এই বিষয়টি প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করেননি। তিনি কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত যাচাই ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।