ঢাকা, রবিবার ২ই অক্টোবর ২০২২ , বাংলা - 

প্রমোশন অফিস প্রধানের মূল্যায়ন

মোঃ আঃ রহিম, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বেসিক ব্যাংক লিমিটেড

2022-09-12
প্রমোশন অফিস প্রধানের মূল্যায়ন

কর্মক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ববোধ, সততা, কর্মনিষ্ঠা, কর্মপ্রিয়তা, কাজের গুণগতমান ও পরিমান, সহকর্মী, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এবং গ্রাহকের প্রতি সদাচারণ এবং সর্বোপরি মান সম্পন্ন অধিক কাজের জন্যই প্রমোশন। ভাল কাজের বিনিময়েই ভালো ভালো প্রমোশন, দ্রুততার সাথে প্রমোশন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই অফিস প্রধান তার নিজ অফিসের সকলের কাজের পরিমান ও গুণগতমান মূল্যায়ন করে থাকেন এবং এ মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করেই উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত মূল্যায়ন করে পদোন্নতি প্রদান করেন। যারা সততা ও নিষ্ঠার সাথে গুণগত মানে ও অধিক পরিমানে ভালো কাজ করেন, তারাই শাখাপ্রধান কর্তৃক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অধিক নম্বর পান, যেমনটি আমরা পরীক্ষার খাতায় সেরা উত্তর লিখে সেরা নম্বর পাই। পরীক্ষার  খাতায় যেমন খারাপ লিখে সেরা নম্বর পাওয়ার কোন সুযোগ নাই, ঠিক একইভাবে অফিসিয়াল পরিমন্ডলে সঠিকভাবে কাজ না করে, সেরা মূল্যায়ন বা সেরা নম্বর পাওয়ার কোন সুযোগ নাই। ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দের সততা, নিষ্ঠা, কাজের গুণগতমান ও পরিমান এবং আচার আচরণ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা শাখা প্রধানের। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ গুরুদায়িত্ব তার উপর ন্যাস্ত করা হয়ে থাকে। শাখাপ্রধান নিজে অধস্তনের মূল্যায়ন পত্রে রেটিং করেন  এবং তার সিনিয়র অথরিটি এ রেটিং যথাযথ মনেকরে কাউন্টার স্বাক্ষর করলেই তা চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় যা পরিবর্তন করার কোন সুযোগ নেই। অতএব অফিস প্রধান তার অধস্তন সকলের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ ও কত ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব তা অনুধাবন করার বিষয়। ম্যানেজার বা অফিস প্রধান হচ্ছেন ম্যানেজমেন্টের লোক বা ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধি।

 

ব্যাংকের মত পেশায় মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫৫ নম্বর সরাসরি শাখা প্রধানের হাতে থাকে। বাকী ৪৫ নম্বর ছকে বাঁধা। যেমন ব্যাংকিং ডিপ্লোমায় ৬ নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১৫ নম্বর, এক প্রমোশন হতে আরেক প্রমোশন পর্যন্ত (সাধারনত ৫ বছর) চাকুরিকালের জন্য ১০ নম্বর, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিবেচনা বা মূল্যায়নের জন্য ৯ নম্বর, পরিচ্ছন্ন ফাইলে ৫ নম্বর। সব মিলিয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে এ ৪৫ নম্বর ছকে বাঁধা। শাখাপ্রধানের হাতের ৫৫ নম্বর তার নিজস্ব বিবেচনা তথা য়ঁধষরঃধঃরাব লঁফমবসবহঃ এর উপর নির্ভরশীল। সেরা কাজে সেরা মূল্যায়ন, শতভাগ নম্বর। দায়িত্বে অবহেলা, অসততা ও আচরণে অনাচার হলে শাখাপ্রধানের বিবেচনা যা হবার তাই হয়ে থাকে। প্রমোশনের ক্ষেত্রে বাস্তবে শাখাপ্রধানের মূল্যায়ন প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। প্রমোশন পাওয়ার  ক্ষেত্রে শাখাপ্রধানই তার মূল্যায়ন ও মতামতের মাধ্যমে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ব্যাংকের চাকুরিতে সফল হতে হলে অফিস প্রধান বা শাখা প্রধানের গুরুত্ব উপলব্ধিতে নিতে হবে।

 

চাকুরিতে যোগদানকালে প্রায় সকলেই একই রকম যোগ্যতা নিয়ে কর্মজীবন শুরুকরেন। প্রমোশনের  ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনে যা ঘটার তাই ঘটে, যা দেখার তাই দেখি। কাজের  ক্ষেত্রে ফাঁকি দিলে জীবন পুড়ে ছাই। কাজে ভালো নেই প্রমোশন নেই, ভালো পোস্টিং নেই, সম্মানের চেয়ার টেবিল ডেস্ক নেই,  ভালো বেতন নেই। তাহলে আছে কী? একই পদে চাকুরিতে এসে যিনি প্রতিনিয়ত সেরাকাজ করলেন, তিনি প্রতিনিয়ত অফিস প্রধানের নিকট থেকে সেরা মূল্যায়ন পেয়ে পেয়ে সেরা পদে চলে গেলেন, সেরা জীবন উপহার পেলেন।  যিনি প্রতিনিয়ত অফিস প্রধানকে ফাঁকি দিলেন ও অফিস প্রধানকে বিব্রত করলেন,  অফিসের কাজকে ফাঁকি দিলেন তথা নিজের কাজকে ফাঁকি দিলেন তার জীবনটাই তো ফাঁকি হয়ে গেল! কী লাভ হল? কী লাভ হতে পারতো! সেরা মূল্যায়ন পেতে কীইবা লাগতো?  শুধুই প্রতিদিনের কাজ সেরাভাবে করা। প্রতিদিনের কর্মঘন্টা সেরাভাবে ও সঠিকভাবে কাজে লাগানো। উর্দ্ধতনকে মেনেচলা, গ্রাহককে গুরুত্ব দেয়া, গ্রাহককে সম্মান করা, তাদের কাজ দ্রুততার সাথে করে দেয়া। মূল্যায়ন পেতে আর কীইবা লাগে? কাজই তো মূল্যায়নের সোপান, কাজই তো মূল্যায়নের সিঁড়ি, কাজই তো প্রমোশনের সিঁড়ি ও কাজই তো প্রমোশনের সদর দরজা।  কাজই তো মূল্যায়ন বয়ে নিয়ে আসে, আগামীতেও বয়ে নিয়ে আসবে। এর বিপরীতে চিত্র কী দেখি? কাজ নেই তো মূল্যায়ন নেই। মূল্যায়ন নেই তো প্রমোশন নেই। প্রমোশন নেই তো  জীবনের উন্নতি নেই। প্রমোশন নেই তো সমৃদ্ধ জীবন নেই। প্রমোশন নেই তো সম্মানের  সাথে জীবন যাপন নেই। এসবই তো হতে পারতো, এসবই তো হতে পারে শুধু অধিক পরিমানে কাজ করে অফিস প্রধানের নিকট থেকে অধিক মূল্যায়ন অর্জন করে। কাজের মাধ্যমে অধিক মূল্যায়ন আদায় করে নিতে হয়। কাজের মাধ্যমে নিজের জীবনের উন্নয়ন, নিজের জীবনের সমৃদ্ধি ও নিজের জীবনের সম্মান সৃস্টি করা কতই না সহজতর কাজ! এ অর্জনের পেছনে শুধুই কর্মক্ষেত্রে কর্মঘণ্টার সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চতকরন এবং অফিস প্রধানের মনোভাব বুঝে সেরা কাজ ও সেরা ফলাফল উপহার দেয়া। কর্মক্ষেত্রে ঘড়ির কাঁটায় মন না রেখে অনর্গল কাজে ডুবে থাকা, অনর্গল কাজ করে যাওয়া। সেরা কাজ উপহার দিয়ে অফিস প্রধানের মনে সেরাভাবে অবস্থান করে নেয়া। অফিস প্রধানের কাজই হচ্ছে অধস্তনকে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সমীপে সুউচ্চ করে তুলে ধরা এবং তার প্রমোশন নিশ্চিত করা। যাদের কাজের উপর ভর করে অফিস বা শাখা এগিয়ে যায়, অফিস প্রধান তাদেরকেই সামনে তুলে ধরেন, সুউচ্চে তুলে ধরেন। তাদের জন্যই সুপারিশকরে প্রমোশন নিশ্চিত করেন।

 

ব্যাংকের মত পেশায় সেরা মূল্যায়ন পাওয়া অত্যন্ত সহজ কাজ। দায়িত্ব নিয়ে এবং দক্ষতার সাথে অধিক পরিমানে কাজ করলেই শাখাপ্রধান সন্তুষ্ট হন এবং বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে তিনি শতভাগ নম্বর প্রদান করে থাকেন। এর পাশাপাশি তিনি কর্মনিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও দক্ষ কর্মীর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রমোশন সংক্রান্ত মন্তব্যের কলামে তাদের প্রমোশনের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সমীপে জোরালো সুপারিশ করে থাকেন। কিন্তু কার জন্য এ সেরা রেটিং? কার জন্য এ জোরালো সুপারিশ? যিনি সেরা কাজ করেন, সেরা আচরণ করেন এবং সেরাভাবে কাজ করে কর্মস্থলকে এগিয়ে নিয়ে যান, সেরা মূল্যায়ন তিনিই পান, সেরা মূল্যায়ন তাকেই করা হয়। প্রমোশনের জন্য সেরা সুপারিশ তার জন্যই করা হয়। সেরা কাজ যিনি করেন, সেরা মূল্যায়ন, সেরা প্রমোশন তার জন্যেই অপেক্ষায় থাকে।

 

বাস্তবে প্রত্যেক শাখা প্রধান প্রতিনিয়ত আশায় থাকেন তার অফিসের সকলে যেন প্রতিনিয়ত সততার সাথে ভাল কাজ করেন এবং অধিক কাজ করে প্রতিষ্ঠানকে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যান যাতে তিনি বছর শেষে সকলকে সেরাভাবে মূল্যায়ন করে জীবন চলার পথে এগিয়ে নিতে পারেন। উর্দ্ধতনের সেরা মূল্যায়নে অধস্তন সহকর্মী যখন এগিয়ে যান এবং জীবন যুদ্ধে ও কর্মপরিসরে অধস্তন যখন অত্যন্ত সফল হন, অফিস প্রধান বা শাখা প্রধান সত্যিকারের তৃপ্তি তখনই পান। কবির ভাষায়,

 

"ধূষর মরুর উষর বুকে একটি যদি শহর গড়

একটি জীবন সফল করা তাহার চাইতে অধিক বড়।"

 

শুধুমাত্র সেরা কাজের মাধ্যমে অফিস প্রধানের মন জয় করে, সেরা মূল্যায়ন ও সেরা নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় এবং নিজের জীবনকে দ্রুততার সাথে এগিয়ে নেয়া যায়। শাখা পর্যায়ে ভালো কাজ করা মানে ম্যানজারকে ম্যানেজকরা, ম্যানেজারকে কাজের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করা এবং নিজের  প্রমোশন নিজেই নিশ্চিত করা। কারণ প্রমোশনের ৫৫% নম্বর ম্যানেজারের হাতেই ন্যাস্ত থাকে। অন্যভাবে বলা যায় ৫৫℅ প্রমোশন ম্যানেজারই দিয়ে থাকেন।  নিজের কাজের মধ্যেই এ নম্বর প্রাপ্তি বা প্রমোশন নিহিত থাকে। প্রতিনিয়ত সেরা কাজের কাজের মাধ্যমে আমরা তা নিশ্চিত করতে পারি,

 

  "আমার প্রতিষ্ঠানের কাজ আমার

  আমার প্রমোশন আমার হাতে।

  অধিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা আমার

  অধিক প্রমোশনও তাই আমার হাতে ।"

 

ইউএসএ এর জেনারেল মটরস কোম্পানির সিইও জনাব ম্যারী বাররার ভাষায়,

 

"একটি প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী যখন বলে কাজটি আমার তখন প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যায় এবং সেরা অবস্থান দখল করে নেয়। বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানও তাদেরকে এগিয়ে নেয় এবং সেরা অবস্থানে আসীন করে।"

 

কর্মবিমুখ জীবন জগদ্দল পাথুরে জীবন, অলস জীবন অপ্রাপ্তির জীবন, কর্মহীন জীবন ব্যর্থ জীবন এবং বিরস জীবন। কর্মপ্রিয় জীবন হল সুন্দর জীবন, কঠোর পরিশ্রমের জীবন হল সুপ্রতিষ্ঠিত জীবন, প্রাপ্তির জীবন, ফুলের মতো সুশোভিত ও সুভাসিত জীবন। কঠোর পরিশ্রমীর জীবন গৌরবময়, গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী জীবন। কবির ভাষায়,

 

"সোনার বাটি ভেঙ্গে ফেলে পাথরে

পাথর পাথরই রয় সোনা থাকে আদরে।"