ঢাকা, বৃহঃস্পতিবার ২৬শে নভেম্বর ২০২০ , বাংলা - 

দুর্নীতি-অনিয়মের আখড়া রূপালী ব্যাংক

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

শুক্রবার ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ ভোর ০৪:২৭:০০

দীর্ঘদিন ধরে রূপালী ব্যাংকের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী লুটেপুটে খাচ্ছে।। তবে গত এক যুগ ধরে সরকার পরিবর্তন হলেও দুর্নীতি-অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো হেরফের হয়নি এই ব্যাংকটিতে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লেবাস ধরে জামায়াত শিবির ব্যাংকটির পিআরডি থেকে উপরের বেশ কিছু স্থান দখল করে আছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, অতীতের সিবিএ কার্যক্রমের মোড়ক পাল্টে স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ গঠন করা হয়েছে। আর স্বাধীনতা শব্দটিকে ব্যবহার করে আগের কায়দাতেই রূপালী ব্যাংকে দুর্নীতি-অনিয়মের মহোৎসব চলছে।

দায়িত্বশীল একটি সুত্র জানায়,পিআরডি;র একটি চক্র বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি মেয়েদের সাথে খারাপ আচারনই করেন না শুধু তারা মেয়েদেরকে খারাপ প্রস্তাব দেয়। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের পিআরডি বিভাগে কানাঘুষা চলছে। কিন্তু পিআরডি দিায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ভয়ে কেউই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

এছাড়াও একাধিক নামের সংগঠন রূপালী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহায়তায় দুর্নীতি-অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গঠিত কমিটিগুলোতেও দেখা যাচ্ছে এই দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের নাম।

অনুসন্ধানে রূপালী ব্যাংকে এক ডজনেরও বেশি দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। এর দাফতরিক নথির কপিও সারাবাংলার হাতে রয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্যাংকটির বেশকিছু পদের নিয়োগে দুর্নীতি। তবে এক্ষেত্রে কেবল দুর্নীতি করেই ক্ষান্ত থাকেননি এই ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তারা নিয়োগ দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত মুছে ফেলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত নথি থেকে নিয়োগ সংক্রান্ত উত্তরপত্র, নম্বর শিটসহ আনুষঙ্গিক তথ্যপত্রও উধাও করে দিয়েছেন।

একাধিক কর্মকর্তাকে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগের শুরু থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রধান কার্যালয় বা শাখায় পোস্টিং দেওয়া রূপালী ব্যাংকে আরেকটি নিয়মিত দুর্নীতির চিত্র। এছাড়াও এখানে দেখা যাচ্ছে, সুবিধাপ্রাপ্ত কমিটিগুলোর সবগুলোতেই ঘুরেফিরে কিছু কর্মকর্তার উপস্থিতি।

ব্যাংকের প্রশিক্ষণ, পদায়ন, গৃহ নির্মাণ ঋণ এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম এখানে চরমে। আর দায়িত্বশীল সূত্র নির্ভর তথ্য হচ্ছে, স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ কমিটির কমবেশি সবাই বিদেশে প্রশিক্ষণের সুবিধা পেয়েছেন এই ব্যাংকে। এছাড়াও প্রশিক্ষণের নামে প্রমোদ ভ্রমণ এবং তাতে ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহীর সাদা কাগজে অনুমোদনের নথিও মিলেছে অনুসন্ধানে। মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের নামে তারিখ ছাড়া মোটা অঙ্কের অনুমোদনের নজিরও পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যাংকের বাহন ব্যবহার রূপালী ব্যাংকে একটি নিত্যচিত্র।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ব্যাংকিং খাতে কোনো অঙ্গসংগঠন না থাকলেও সরকার দলীয় অনুমোদিত সংগঠন বলে প্রভাব বিস্তার এখানে দৃশ্যমান, যা ভাইয়া গ্রুপ নামে পরিচিত।

এছাড়া ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ইমেইল জালিয়াতি করে বরখাস্ত হওয়া কমকর্তা, শাখা ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় গ্রাহকের এফডিআর (স্থায়ী আমানত) আত্মসাৎ, কর্মকর্তাদের মারধরের কারণে বরখাস্ত হওয়া, ভুয়া সনদসহ অবৈধ উপায়ে পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া— এমন সব অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণও মিলছ।

সূত্র বলছে, এসব অভিযোগ অভিযুক্তরা রূপালী ব্যাংকে বেশ দাপটের সঙ্গেই কাজ করছেন। তবে বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এসেছে এবং এরই মধ্যে রূপালী ব্যাংককে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম-পরিচালক (টাস্কফোর্স সেল) মাহমুদুন নবী গত পহেলা জানুয়ারি রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে এবং নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও রূপালি ব্যাংকে চাকরি হওয়ার মতো ঘটনার কথা জানা যায়। চিঠিতে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে বিষয়টিতে রূপালী ব্যাংকের জবাব জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যাংকটিতে ২০১৪ সালে সিনিয়র অফিসার ও অফিসার পদের নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৬০ জন কর্মকর্তা ভুয়া সনদ এবং নিয়োগ পরীক্ষায় মূল প্রার্থীদের বদলে ভাড়া করা চুক্তিভিত্তিক লোক দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পান।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ওই নিয়োগ দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথি থেকে নিয়োগ সংক্রান্ত উত্তরপত্র, নম্বর শিটসহ আনুষঙ্গিক তথ্যপত্র এরই মধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে রূপালী ব্যাংকের নিয়োগ দুর্নীতিতে সরাসরি যুক্ত ১৫ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়। সূত্র জানায়, এদের মধ্যে একাধিক কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্রসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হলেও অদৃশ্য ইশারায় সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে যায়।

 অনুসন্ধানে ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের সই করা ‘ব্যয় হিসাব কল্যাণ ও বিনোদন (ক্রীড়া পরিষদ)’ শীর্ষক ছয় লাখ টাকার তারিখ বিহীন একটি চেকের অনুমোদনের কপির খবর পাওয়া গেছে।

ওই চেকের ট্রানজিট ডেবিটের ঘরে লেখা আছে ‘রূপালী ব্যাংক লি. ক্রীড়া পরিষদ, প্রধান কার্যালয়ের নোট মোতাবেক এবং মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে উক্ত টাকা দোয়া ও ইফতার মাহফিলের ব্যয় স্থানীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা হলো।’

দুর্নীতি অনিয়মে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কর্মসূচিকেও ব্যবহারের নজির মিলেছে রূপালী ব্যাংকে।

সূত্র জানায়, এই উদযাপন উপলক্ষে রূপালী ব্যাংক চার সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি, ৪৬ সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটি, ১০ সদস্যের অর্থ বিষয়ক উপকমিটি, ১৩ সদস্যের প্রচার ও মিডিয়া উপকমিটি, ৫ সদস্যের দফতর উপকমিটি, ১০ সদস্যের প্রকাশনা উপকমিটি, ১১ সদস্যের মঞ্চ ও সাজসজ্জা উপকমিটি, ৩০ সদস্যের অভ্যর্থনা উপকমিটি, ২০ সদস্যের আপ্যায়ন উপকমিটি, ৫ সদস্যের নিরাপত্তা উপকমিটি, ১৫ সদস্যের সাংস্কৃতিক উপকমিটি, ৫ সদস্যের যোগাযোগ রক্ষা উপকমিটি, ৭ সদস্যের ডকুমেন্টশন উপকমিটি এবং ৪৫ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে।

এই কমিটি পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কমিটির বিভিন্ন উপকমিটিতে ঘুরে-ফিরে কতিপয় কর্মকর্তার নাম বারবার এসেছে। আর নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরাও এসব কমিটিতে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে স্থান পাওয়া স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের একাধিক সদস্য রয়েছেন, যারা বিএনপি-জামাতের অনুসারী জিয়া পরিষদের সাবেক সদস্য।

 অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে আগে, গত ছয় মাসে প্রশিক্ষণের নামে ভারতের পুনে, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইসহ দেশের বাইরে বেশ কয়েকটি স্থানে ব্যাংকের অর্থে ভ্রমণ করেছেন ব্যাংকটির দাপুটে কর্মকর্তারা। এসব ভ্রমণের বিষয়ে রূপালী ব্যাংকে ব্যস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সাদা কাগজে সই করে অনুমোদন দেন।

 অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাকে এসএমএস’র মাধ্যমে বিষয়টিতে কথা বলার অনুমতি চান এই প্রতিবেদন। পরে ব্যাংকটির জনসংযোগ কর্মকর্তা ফোন করে জানিয়েছেন, সুবিধামতো সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলবেন। এ ব্যাপারে ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলে জানাযায় পিআরডি জামায়াত শিবিরের আখড়া বলেই এমডির কাছাকাছি যেতে দিচ্ছে না তারা বলেছেন ব্যাংকটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।