ঢাকা, বৃহঃস্পতিবার ১৭ই অক্টোবর ২০১৯ , বাংলা - 

মেঘনা নদী গ্রাস করছে মেঘনা গ্রুপ !

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

রবিবার ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ বিকাল ০৩:১৫:১৭

জমি কেনা হয়েছে ৫৬৬ বিঘা, কিন্তু দখলে আছে এক হাজার ৬০০ বিঘা। সরকারি খাসজমি, নদী দখল এবং ব্যক্তিমালিকানার জমি দখল করা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৩৪ বিঘা। ভূমিদস্যুতার এমনই নজির স্থাপনের অভিযোগ এসেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে।

সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড সুবিধার আড়ালে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার খবরে আলোচনায় আসা মেঘনার গ্রুপের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রকাশ পাচ্ছে। গ্রুপটির বিরুদ্ধে এবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনা নদী দখল করে সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ এসেছে। বালু ফেলে নদী ভরাট করে এবং সরকারি খাসজমি দখল করে বিভিন্ন শিল্প কারখানা এবং স্থাপনা গড়ে তুলছে মেঘনা গ্রুপ এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনার শাখা নদী মারীখালী নদীর অংশের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে পাড় থেকে নদীর ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত দখল করার অভিযোগ উঠেছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে। নদী মেঘনার অন্তত ৩০০ বিঘা জমি দখল করেছে গ্রুপ মেঘনা। দখলকৃত এসব স্থানে ইতোমধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে মেঘনার মালিকানাধীন ফ্রেশ টি, ফ্রেশ সুগার মিলস, পেপার মিলস, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান।

 ভূমিদস্যুতার এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই মেঘনার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। গ্রুপের ‘ভাগ্নি জামাই’ বলে পরিচিত আল মোস্তফার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোস্তফা গ্রুপও নদী দখল করে ব্যাগের কারখানা গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভূমি দালালদের। ২০১০ সাল থেকে ধাপে ধাপে এবং একটু একটু করে এসব জমি দখল করা হয়।  নদী মেঘনা দখল করে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সময়ে মেঘনা গ্রুপের জন্য ব্যক্তিমালিকানার জমি কেনার কাজে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিমালিকানার জমি কেনার মাধ্যমে ভূমি দখলের প্রথম ধাপ শুরু করে মেঘনা। ব্যক্তিমালিকানার মালিকেরা জমি বিক্রি না করলে শুরু হয় তাদের ওপর অত্যাচার। বেনামি, ভুয়া ও জাল দলিল দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় জমি। দখলকৃত জমির আশেপাশে অন্যান্য ব্যক্তিমালিকানার জমিও ছাড় পায় না এই আগ্রাসন থেকে। এরপর শুরু হয় নদী দখলের মূল পর্ব।

স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম বলেন, গঙ্গানগর নামক এলাকায় মেঘনা ৪৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার হাউজের পাশে প্রথমে ১৬ বিঘা জমি কেনে মেঘনা গ্রুপ। কিন্তু এরপর দেখতে দেখতে সেখানে প্রায় দেড়শ’ বিঘা জমি দখল করে সেখানে চা ফ্যাক্টরি বানায় তারা।

 চর রমজান মৌজার ঝাউচর এলাকায় ৩০০ বিঘা জমি দখলে আছে তাদের। এরমধ্যে প্রায় দেড়শ’ বিঘা জমি কেনে তারা। বিভিন্ন দাগে জমি কিনে পরে একসঙ্গে দখল করে নেয় অনেকের জমি। এখানে ব্যক্তিমালিকানার ৫০ বিঘা এবং নদী থেকে আরও ১০০ বিঘা দখল করা হয়।

মেঘনা গ্রুপের ভয়ে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছয় হিস্যা মৌজায় মাত্র ৩০০ বিঘা জমি কেনে মেঘনা গ্রুপ। তবে তাদের দখলে আছে প্রায় ৮০০ বিঘা। মানে দখল ৫০০ বিঘার বেশি। আষাড়িয়ার চর এলাকা দীর্ঘদিন যাবত খাসজমি হিসেবে ছিল। গ্রামবাসী অল্পকিছু জমিতে চাষবাস করতো। কিন্তু এগুলো এখন সব মেঘনার (মেঘনা গ্রুপ) দখলে। খাসজমিসহ নদীর প্রায় ২০০ বিঘা দখল করে তারা।

স্থানীয়দের সূত্রে পাওয়া এসব হিসাব থেকে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার ৬০০ বিঘা দখলে রাখা মেঘনা গ্রুপের নিজস্ব কেনা জমি মাত্র ৫৬৬ বিঘা। বাকি এক হাজার ৩৪ বিঘা জমি ব্যক্তিমালিকানায় থাকা অথবা সরকারি খাসজমি এবং নদী দখল করে আয়ত্ত করা হয়।

মেঘনা গ্রুপের এমন দখলে সাধারণ গতিপথ হারাতে শুরু করেছে খোদ বহতা মেঘনা। নদী ডাকাতির এমন কর্মকাণ্ডে অস্তিত্ব সংকটের হুমকিতে আছে আশেপাশে নদী সংলগ্ন বিভিন্ন নিচু এলাকা ও চর জমি।নদী মেঘনা দখল করে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা।সরেজমিনে দেখা যায়, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায় মেঘনা নদীর প্রায় পাঁচশ’ ফুট জায়গা দখল করে মাটি ভরাটের কাজ করছে মেঘনা গ্রুপ।

 প্রায় ৫০ একর জমি দখল করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শত বছরের পুরনো ও লক্ষাধিক মানুষের সমাগমস্থল স্থানীয় আনন্দবাজার। এছাড়া পিরোজপুর ইউনিয়নের ছয়হিস্যা, কান্দারগাঁও, জৈনপুর, চরভবনাথপুর, দুধঘাটা, কুরবানপুর এলাকার নদী, সরকারী খাসজমিসহ ১০০ বিঘা গ্রাস করেছে মেঘনা গ্রুপ।

মেঘনা নদীর কিছু অংশে পাঁচশত আবার কিছু অংশে সাতশত ফুট পর্যন্ত নদী দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ। উপজেলার আষাড়িয়ারচর ও ঝাউচর এলাকায় নদীর অধিকাংশ বালু ভরাট করে ফেলেছে তারা। নদীগর্ভের প্রায় ৭০০ ফুট দখলে নিয়ে বর্তমানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেছে গ্রুপটি। হাড়িয়া এলাকার মেঘনা নদীতে অবৈধ স্থাপনা ও জেটি নির্মাণ করে দখল করেছে।

 নদী গর্ভের প্রায় ৭০০ ফুট ভরাট করে পাইলিংয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নদী দখলের কাজও চলছে বেশ জোরেশোরে। মেঘনা নদীর শাখা ঐতিহাসিক সরকারি রান্দীর খালের প্রায় ২ কিলোমিটার বালু দিয়ে ভরাটসহ নদীর প্রায় এক হাজার ৫ শত বিঘা জমি ভরাট করে চারদিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা এলাকায় বালু ভরাট করে চলছে শিল্প প্রতিষ্ঠানে নির্মাণের কাজ।

নদী দখল করে নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ার এই মহাযজ্ঞে মেঘনা গ্রুপ প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাহায্য পাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মেঘনা গ্রুপের গভীর সুসম্পর্ক আছে বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। অবৈধভাবে নদী ও জমি  দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি বলেও দাবি ভুক্তভোগীদের।

সোনারগাঁ উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদী দখলের অভিযোগে মেঘনা ঘাট এলাকার মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নদী ও সরকারি সম্পত্তি এবং খাস জমির দখল ছেড়ে দিতে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে সোনারগাঁ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়। ওই নোটিশের প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও রহস্যজনক কারণে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার আকস্মিকভাবে সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় মেঘনা নদী দখলের ভয়াবহতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা। পরে তিনি সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, বর্তমানে মেঘনা নদীর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ভয়াবহ। এসব দখলদার যতই ক্ষমতাশীল হোক না কেন, কয়েক দিনের মধ্যে তাদের স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

 প্রয়োজনে নদী রক্ষা কমিশন থেকে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঙ্গে এনে অভিযান পরিচালনা করা হবে।নদী মেঘনা দখল করে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা। তখন নদী দখলের ভয়াবহতা দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে এসব দখলদারের তালিকা আমি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাবো।

এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার  বলেন, কাউকে নদী দখল করতে দেওয়া হবে না। দখলকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজমুল হোসাইন বলেন, কর্মস্থলে আমি নতুন যোগদান করেছি। খোঁজ-খবর নিয়ে নদী দখলকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা  বলেন, নদী দখলদারদের চিহ্নিত করতে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. সাঈদ আনোয়ার বলেন, কেউ যদি বেআইনিভাবে নদী দখল করে থাকে তাহলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তা উচ্ছেদ করবো।