ঢাকা, বৃহঃস্পতিবার ১৭ই অক্টোবর ২০১৯ , বাংলা - 

বাস কেড়ে নিল তাদের সব সুখ

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

বৃহঃস্পতিবার ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ ভোর ০৫:১৬:২৫

দুই ছেলে-এক মেয়েকে নিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল পারভেজ-রুমানা দম্পতির সময়। লাগামহীন সড়ক ব্যবস্থাপনার এ শহর চোখের পলকেই কেড়ে নিয়েছে তাদের সব সুখ আর স্বপ্ন। বাসচাপায় অকালে প্রাণ গেছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রবের (৫৬)। কে জানতো, আরও ভয়াবহ নৃশংসতা অপেক্ষা করছে পরিবারটির ভাগ্যে?

স্বামী হারানোর শোক তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি রুমানা পারভেজ, এর মাত্র দু’দিনের মাথায় আবারও বাসচাপাতেই গুরুতর আহত হয়েছেন ছোট ছেলে ইয়াসির আলভী। এখন হাসপাতালে সন্তানের বিছানার পাশে নির্ঘুম রাত কাটছে এ বিধবা নারীর। অসহায়ের মতো আহত সন্তানের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন সারাক্ষণ। শোকগ্রস্ত পরিবারটির সুখ তো দূরের স্বপ্ন, যেন শোকই কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বিছানায়!

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তুরাগে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রব নিহত হন। দু’দিন পর বাবার কুলখানির বাজার করতে যাওয়ার সময় একই পরিবহনের আরেকটি বাসে বন্ধুসহ দুর্ঘটনার শিকার হন আলভী। তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন ঘটনাস্থলেই মারা যান। কোমরের চারটি হাঁড় ভেঙ্গে যাওয়া আলভী এখন শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

বৃহস্পতিবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ঘটনার দিনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন ইয়াসির আলভী। তিনি বলেন, ফাঁকা দেখে একটি বাসে উঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, হেলপার আমাদের না নিয়ে বাসের দরজা বন্ধ করে দেয়। বাসের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে চালকের কাছে জানতে চাই, দরজা কেন বন্ধ করে দিয়েছে? আর, তখনই চালক আমার দিকে তাকিয়ে বাস স্টার্ট দিয়ে দ্রুতগতিতে চালাতে থাকে। বারবার বলা সত্ত্বেও সে বাস থামায়নি। আমি কোনোমতে জানালা ধরে ঝুলে ছিলাম। আর, ছোটন পেছন পেছন আমাকে বাঁচানোর জন্য দৌঁড়াচ্ছিল।

‘হঠাৎ দেখতে পাই, সামনে আরেকটি মিনিবাস দাঁড়িয়ে আছে। তখন, বাস থামানোর জন্য আবারও কাকুতি-মিনতি করেছি। কিন্তু, না থামানোয় দ্রুতগতিতে গিয়ে ওই বাসটিতে ধাক্কা খাই। আর, পেছনে দৌঁড়াতে থাকা আমার বন্ধু দুই বাসের মাঝখানে চাপা পড়ে।’

আলভী বলেন, বাবার কুলখানির বাজার করতে ছোটনকে নিয়ে টঙ্গী যাচ্ছিলাম। প্রথমে, উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় কামারপাড়া যাই। সেখান থেকে বাসে করে উত্তরা স্লুইসগেট পর্যন্ত গিয়ে তীব্র যানজটের কারণে নেমে যাই। যানজট পার হয়ে কিছুটা সামনে গিয়ে ওই বাসটি ফাঁকা দেখে ওঠার চেষ্টা করেছিলাম।

তিনি বলেন, জানতাম না, সেটাও ভিক্টর পরিবহনের বাস ছিল। জানলে ওই বাসে ওঠার চেষ্টাই করতাম না। চালক সম্ভবত আমাকে চিনতে পেরেছে। সে কারণে ইচ্ছা করেই আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। কারণ, তারা হয়তো জানতো, বাবাকে চাপা দিয়ে হত্যার কারণে আমরা ভিক্টর পরিবহনের নামে মামলা করেছি।

তবে, এ দুর্ঘটনার পর (৮ সেপ্টেম্বর) পারভেজ রবের বন্ধু আলী আসরাফ আখন জানিয়েছিলেন, সঙ্গীত পরিচালকের মৃত্যুর ঘটনায় ভিক্টর পরিবহনের কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে আসছিলেন কামারপাড়া এলাকায়। একপর্যায়ে পরিবহনের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালিয়ে মারপিট শুরু করেন। তখন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস তাদের উপর উঠিয়ে দেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার পর আলভী ও ছোটন বন্ধু রাসেল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, আলভীর বাবার মৃত্যুর ঘটনায় বাস মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। সে টাকা নিতেই আলভী ও ছোটন আরও পাঁচ-ছয়জনকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্টর পরিবহনের স্ট্যান্ডে যান। সেখানে বাসের দু’জনের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। সে সময় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস আলভী ও ছোটনকে পাশে দাঁড়ানো আরেকটি বাসের সঙ্গে চাপা দেয়।

বাসচাপায় আলভী আহত ও তার বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনায় গত ৮ সেপ্টেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন ছোটনের মামাতো ভাই মো. ফিরোজ। মামলার এজাহারের বলা হয়, মেহেদী হাসান ছোটন ও ইয়াসির আলভী উত্তরার স্লুইসগেট বাসস্ট্যান্ড ও আবদুল্লাহপুরের মাঝামাঝি এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনের একটি বেপরোয়া গতির বাস পেছন থেকে ধাক্কা দিলে তারা গুরুতর আহত হন। তাদের উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত ১১টার দিকে চিকিৎসকেরা ছোটনকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাবা নেই, হারিয়েছেন প্রাণপ্রিয় বন্ধুকেও, আড্ডা-গানে মেতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী আলভী এখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বিছানায়। সামান্য নড়া-চড়াও করতে পারছেন না, জানেন না কবে সুস্থ হয়ে উঠবেন। মাঝেমধ্যেই লুকিয়ে চোখ মোছেন। তবে, উপযুক্ত চিকিৎসা পেলে ফের উঠে দাঁড়ানোর আশা আছে তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যারা এ অবস্থা করেছে, তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।

আলভীর মা রুমানা পারভেজ শোক আর দুশ্চিন্তায় অনেকটাই পাথর হয়ে গেছেন। প্রয়োজন ছাড়া সামান্য কথাও বলতে চান না। স্বামী নেই, সংসারের সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পঙ্গু হতে বসা এক সন্তানের চিকিৎসার খরচও। এত এত দুশ্চিন্তার মধ্যে শোক সইবার সময় কই?

তিনি বলেন, স্বামীকে কবরে রেখে আসলাম। তার কুলখানি করার আগে ছেলেও অ্যাক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে। ভিক্টর পরিবহনের বাস ইচ্ছে করেই আমার ছেলেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আমি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।পরক্ষণেই বিড়বিড় করে বলে চলেন, এখন ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব? আর, ছেলের চিকিৎসার টাকাই কোথা থেকে আনবো?

পারভেজ-রোমানা দম্পতির বড় ছেলে ইয়াসিন ইরশাব মালয়েশিয়ায় হোটেলে ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করছেন, অসুস্থ আলভী উত্তরা টাউন কলেজে বিবিএ’তে ও মেয়ে ইবনাত কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন চন্দ্র সাহা বলেন, ঘটনার পরপরই ভিক্টর পরিবহনের ওই বাসটিকে জব্দ ও এর চালক রফিকুল ইসলামকে আটক করা হয়। তবে, পালিয়ে গেছে চালকের সহকারী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাসচালক দাবি করেছেন, হঠাৎ তাকে মারধর করায় আত্মরক্ষার্থে গাড়ি টান দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা যায়, পারভেজ রবকে চাপা দেওয়া ভিক্টর ক্ল্যাসিকের আরেকটি বাসের চালক-সহকারী এখনো পলাতক রয়েছে।।