ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩শে জুলাই ২০১৯ , বাংলা - 

খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকে তারল্য সংকট

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

বৃহঃস্পতিবার ৯ই মে ২০১৯ দুপুর ০১:৩০:১৬

বড় ধরনের তারল্য বা নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে ব্যাংক খাত। চাহিদা অনুযায়ী আমানত সংগ্রহ করতে না পারায় বেশিরভাগ ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, নিয়মিত খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় এই সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই সংকট মোকাবিলায় অনেক ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করতে চাইলেও গ্রাহকদের সাড়া মিলছে না। ফলে, ব্যাংকের সুদের হার ১৬/১৭ শতাংশে পৌঁছে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া ও চাহিদামতো ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করতে না পারায় ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, তারল্য সংকটের প্রধান কারণ ব্যাংকের ওপর লোকজনের আস্থাহীনতা। তাই ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রতি মাসে কমে যাচ্ছে। এছাড়াও, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ও ব্যাংকের সুদে পার্থক্য এবং নানা কেলেঙ্কারীর কারণে ডিপোজিট (আমানত) কমে যাচ্ছে। আর ডিপোজিট কমলে তারল্য সংকট দেখা দেবে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে হবে। এতে করে মানুষের আস্থা ফিরবে এবং আমানত সংগ্রহ বাড়বে। তা না করতে পারলে কোনো লাভ হবে না।

সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হয়তো সম্ভব হবে না। তবে বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রির যে লক্ষ্যমাত্রা থাকে, তা পূরণ হলে বিক্রি বন্ধ করে দিতে হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো আমানতের তুলনায় বেশি ঋণ দিয়ে তা আদায় করতে পারছে না। এতে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। অনেক গ্রাহক এখন ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহ পান না। আবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি থাকায় মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে, ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না।

তারল্য সংকটের কথা স্বীকার করে নেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট রয়েছে— এটা অস্বীকার করা যাবে না। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের টাকা আটকে গেছে। খেলাপি ঋণ উদ্ধার না হওয়া একটা বড় সমস্যা। এছাড়াও খেলাপিদের নানা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এবিবি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আমানতের ওপর নির্ভরশীল। এটার পাশাপাশি বন্ড মার্কেট, ক্যাপিটাল মার্কেটও দরকার। এছাড়াও, স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে। এসব কারণে নানা ঝামেলা হচ্ছে।

উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের বন্ড মার্কেট তৈরি করতে হবে। তখন দীর্ঘ মেয়াদে থাকা ঋণ বন্ড বিক্রির মাধ্যমে রিপ্লেস করতে হবে।

ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণ

দুই বছর আগেও ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ছিল না। ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ অলস হয়ে পড়েছিল। এই অলস অর্থ কিভাবে বিনিয়োগ করা হবে, সেটাই ছিল আলোচনার বিষয়। কিন্তু আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া এবং খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়াও আমদানি খরচ বাড়লেও বাড়েনি রফতানি ও প্রবাসী আয়। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে বেশ কয়েকটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারীর কারণে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এখন অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। এসব কারণে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়াও, খেলাপি হলে সুবিধা পাওয়া যাবে— এই আশায় অনেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে খেলাপি হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে ঋণ আদায় কমে যাচ্ছে, তারল্য সংকট বেড়ে যাচ্ছে।

তারল্য সংকটের চিত্র

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই ২০১৮ থেকে জানুয়রি ২০১৯) ব্যাংকে ঋণ বেড়েছে ৬৭ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬১ হাজার ১২ কোটি টাকার।

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ

২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এর বাইরেও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হিসাব থেকে বাদ দিতে অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো। এগুলোও খেলাপি ঋণ। এছাড়া গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এদিকে, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ৪৮ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। সরকারি বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের খেলাপি ৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ৩৮ হাজার ২২৫ কোটি টাকা, বিদেশি ব্যাংকগুলো খেলাপি ২ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা।

শীর্ষ ঋণ খেলাপি ব্যাংক

খেলাপি ঋণের শীর্ষ তালিকায় আছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপির ঋণে ১৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে সোনালি ব্যাংক ১১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৯ হাজার ৩৪৪ কোটি, অগ্রণী ব্যাকের ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ফারমার্স ব্যাংক (নতুন নাম পদ্মা) ৩ হাজার ৭০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা।

ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুয়ায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ১১ লাখ ৬১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারি আমানত ৭৫ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, সাধারণ গ্রাহকের আমানত ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত ৫ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা আমানত (এনএফসিডি) ৮৩৮ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে সরকারের দেওয়া সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সুবিধা

চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাতের করপোরেট কর সাড়ে ৪২ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে টানা ৯ বছর এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি আমানত রাখার সীমা ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। এসবের বিনিময়ে ব্যাংকগুলোর আমানত ও সুদের হার নয়-ছয় করার কথা থাকলেও বাস্তবে আমানত নিচ্ছে ১০ শতাংশের বেশি এবং ঋণের সুদ ১৫/১৬ শতাংশ।