ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩শে জুলাই ২০১৯ , বাংলা - 

৩০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত

ষ্টাফরিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

রবিবার ১৭ই মার্চ ২০১৯ রাত ১১:৪১:৪৪

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ঋণ তথ্য ভাণ্ডার বা সিআইবিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন গ্রাহকের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করলে গ্রাহকদের পক্ষ থেক উচ্চ আদালতে ব্যাংকের সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করা হয়। আদালত ঐ ঋণ নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা যাবে না মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

ফলে ঐসব ঋণ খেলাপি হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবিতে চিহ্নিত করা হলেও পরে তা নিয়মিত হিসাবে রাখতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।এতে একদিকে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, অন্য দিকে গ্রাহকরা ঋণ খেলাপির দুর্নাম থেকে বেঁচে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গ্রাহক যেহেতু ঋণ খেলাপি নন, সেই কারণে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণও পাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঋণ খেলাপিরাই এই সুযোগটি বেশি নিচ্ছেন। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করলে, গ্রাহক এর বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন। আদালতে রিট করে তাকে ঋণ খেলাপি বলা যাবে না এই মর্মে নির্দেশনা পেতে পারেন।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আদালতের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে যথাযথ যুক্তি উপস্থাপন করে রিট খারিজ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। একই সঙ্গে ঐ ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব সিআইবিতে আবার খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, এই বিধি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মানছে না। কোনো খেলাপি ঋণ গ্রাহকের রিটের কারণে নিয়মিত হলে সেই রিট খারিজ করতে ব্যাংকের আইন বিভাগ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে প্রাথমিকভাবে মডেল ভিত্তিতে তিনটি ব্যাংকে এ ধরনের ১৫টি শীর্ষ গ্রাহকের ফাইল তদন্তের সিন্ধান্ত হয় সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে।

ব্যাংকগুলো হচ্ছে সরকারি খাতের জনতা, বেসরকারি খাতের এবি ও ইসলামী শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোর প্রতিটির শীর্ষ পাঁচ রিটকারী ঋণ গ্রহীতার ফাইল তদন্ত করা হবে। এ জন্য তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এতে দেখা হবে, গ্রাহক রিট করে খেলাপি ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানোর জন্য উচ্চ আদালতের আদেশ পাওয়ার পর ব্যাংক থেকে রিট খারিজ করাতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোন গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, রিটের কারণে জনতা ব্যাংকে আড়াই হাজার কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকে এক হাজার ২২ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকে ৫৩৮ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৭০০ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংকে ২০০ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১৪৪ কোটি টাকা, সরকারি আরও ব্যাংকে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রিটের কারণে নিয়মিত করা হচ্ছে।

এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি, সাউথ ইস্ট ব্যাংকে দেড় হাজার কোটি টাকা, কমার্স ব্যাংকে ৮০০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ৩০০ কোটি টাকা একই কারণে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। বাকি অর্থ অন্যান্য ব্যাংকে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোও এই আইনি বেড়াজালে আক্রান্ত।

সূত্র জানায়, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনের সময় ঋণ খেলাপিদের একটি অংশ ঋণ শোধ না করে তড়িগড়ি করে আদালতে রিট করে তাকে ঋণ খেলাপি বলা যাবে না মর্মে আদেশ পেয়ে যাচ্ছে। পরে এ আদেশ খারিজ হলেও ততদিনে সংশ্লিষ্ট খেলাপি নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে গেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রিটের বিরুদ্ধে অনেক ব্যাংকই যথাযথ পদক্ষেপ নেন না। যে কারণে রিট করে অনেক খেলাপি পার পেয়ে যান। ঋণ খেলাপি ও ব্যাংকের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার মধ্যে এ ব্যাপারে যোগসাজশ থাকলে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।’

জনতা ব্যাংকে বহুল আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ খেলাপি করা হলে গ্রাহক আদালতে রিট করে তার ঋণ নিয়মিত রাখার আদেশ পেয়েছিল। পরে ব্যাংক আইনি পদক্ষেপ নিয়ে তার রিট খারিজ করে। এখন ক্রিসেন্ট গ্রুপের সমুদয় ঋণ খেলাপি। যে কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এর বাইরে আরও অনেক গ্রুপ রয়েছে যারা স্থগিতাদেশ নিয়ে নিজেদেরকে খেলাপির দুর্নাম থেকে মুক্ত রাখছে।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনে অনেক অস্পষ্টতা থাকায় উদ্যোগ নিয়েও রিট খারিজ করা সম্ভব হয় না। এ জন্য আইন আরও স্পষ্ট করতে হবে।’

বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক সিটিসেলকে ঋণ দেওয়ার জন্য এক হাজার ২০০ কোটি টাকা গ্যারান্টি দিয়ে বিপাকে পড়ে। সিটিসেল ঋণ শোধ না করায় এখন সেগুলো খেলাপি। সিটিসেল রিট করে খেলাপির দুর্নাম বেশ কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখলেও এখন তারা খেলাপি।

আল আরাফাহ ব্যাংকে পরিচালকদের মধ্যে আগে এসব জটিলতা ছিল। ব্যাংকটির মালিকানা হাতবদল হওয়ার পর এখন আর এগুলো নেই।