ঢাকা, শনিবার ২৫শে মে ২০১৯ , বাংলা - 

জোছনা রাতের ফানুস,লেখক : ধ্রুব খান

লেখক : ধ্রুব খান

বৃহঃস্পতিবার ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সকাল ১১:৫৮:০৩

নবনী খুব তাড়াহুড়ো করে তার ঘর গোছাচ্ছে কেননা সে খুলনা যাবে বেড়াতে। তবে সে নিজেকে গালি দেওয়ায় ব্যস্ত কারণ ব্যাগ টা কোনোভাবেই তার কাপড় গুলো নিতে পারছে না। এই সময় হঠাৎ তার আলমারির উপরের একটা সুটকেস এ চোখ গেল৷ সেটা তার নানীজান দিয়ে ছিল। বলেছিল সেটাতে নাকি নবনীর মায়ের সব গহনা আছে। কিন্তু কখনোই তা বের করা হয়নি। আজ সুটকেস্টার প্রয়োজন। নবনী সুটকেস্টা বের করে গহনা গুলো আলাদা রেখে দিল। এখন সে খুব সাছন্দে কাপড় গুছাতে পারলো৷ সে অনেক গুলো কাপড় নিচ্ছে৷ তিনদিনের জার্নিতে এতো কিছু কেন নেওয়া হচ্ছে সেটা তার নানিজান পিছনে দাঁড়িয়ে কোনোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন না৷ নবনী খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে তার নানীজান পিছে এসে দাড়িয়েছে কারন প্রবল মাত্রায় জর্দ্দার গন্ধ আসছে৷ নবনী খুব অস্বস্তি বোধ করলো কারণ তার নানীজান কাপড় বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলে সে বলতে পারবে না তাদের সাথে খুলনায় নবনীর বান্ধবী নীতির ক্লাসমেট রাফিনও যাচ্ছে৷ ছেলেটাকে কেন জানি নবনীর খুব ভালো লেগেছে। এই কথা তার নানীজান কে বললে নিশ্চিত তার নানীজান বলে উঠবে। "যেয়ে মেয়ের কিনা ৪ টা বিয়ে ভেঙে গেছে তার আবার মনে এতো রং কিসের "

রাজীন এর খুব রাগ হচ্ছে কারণ তার পাশের সিটে বসা লোকটা কট কট করে বুট খাচ্ছে৷ সে জানালার দিকে ফিরে ট্রেনের ঝিক ঝিক তাল মিলিয়ে মনে মনে বলার চেষ্টা করছে। "কুকুর ছানা, কুকুর ছানা" সম্ভবত পাশের লোকটাকে এমন কিছু বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছে৷ জানালার দিকে ফিরে তাকানোর আরেকটা কারণ হচ্ছে পাশের লোকটা হয়ত তাকে বুট খেতে বলবে কিন্তু অনিচ্ছায়। ভদ্রতা করে৷ সেই সমস্যায় লোকটাকে ফেলানোর কোনো ইচ্ছে তার নেই। কিছুটা ঘুম আসতেই কেউ একজন তার গায়ের খুব স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়েছে। রাজীন চমকে উঠে চোখ খুলে দেখে একদল হিজরা তাদের বগীর সবার কাছে টাকা চাচ্ছে৷ রাজীন সম্ভবত বাঘের থেকেও হিজরা ভয় পায়৷ সে ৫০ টাকার একটা নোট দিতেই হিজরাটি তার মাথায় হাত বোলালো৷ রাজীন খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। সে পানি খাওয়ার জন্য হাতে বোতল নিলো। পাশের লোকটি লোলুপ দৃষ্টুতে বোতল এর দিকে তাকিয়ে রইলো৷ লোকটির জন্য রাজীন এর খুব মায়া হলো কারণ একজন হিজরা তার সাথে খুব বিশ্রী একটা কাজ করেছে।

নবনীরা খুলনা এসে পৌছে গেছে সকাল ৮.৩০ এ। নবনীর পাশে বসে আছে তার বান্ধবী নীতি আর বরাবর সামনে বসে আছে রাফিন। রাফিনের পাশে বসে আছে নীতির চাচাতো ভাই কাওসার যে কুয়েটে পংব সাব্জেক্টে অনার্স করছে৷ মূলত কাওসার ই তাদের ঘুরে দেখাবে খুলনা শহরটা৷ তাদের সবার এখন কাজ একটাই খাবারে জন্য অপেক্ষা করা৷ হঠাৎ  কাওসার বলে উঠলো।

- আপু আমার একটু স্টেশন যেতে হবে। এক বড় ভাই আসবে৷ আমার রুমমেট ছিলেন তাকে একটু নিতে যেতে হবে।

বলেই চলে গেলো।  নাস্তা খাওয়ার সময় নীতি আর রাফিন অনেক কথা বলতে লাগলো। কিন্তু নবনী শুধু রাফিনের ভ্রুর দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ কথা বলার সময় ওর ভ্রুর নেচে উঠা দেখে নবনীর খুব ই ভালো লাগছিলো৷

রাজীন এর কেন জানি সব অচেনা লাগছে৷ সে কাওসারকে জিজ্ঞেস করলো।

- কিরে এখানে না একটা টং ছিলো?

- জ্বী ভাই সেটা নিয়ে অনেক গেঞ্জাম হয়েছিলো পরে সেটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে৷

- ওহ। আমার জিনিসগুলা কিছুদিন তোর কাছে রাখ। আমার যেতে ২ দিন লাগবে। কোন হোটেল ভালো এখন?

- ভাই আমার পাশের ছেলেটার পা ভেঙে গেছে। ও কিছুদিনের জন্য বাড়ি গিয়েছে। তুমি চাইলে থাকতে পারো৷

- আচ্ছা তাহলে তো ভালোই৷

২য় দিন সকালে তারা বের হয়েছে ঘুরতে। জায়গাটা খুব সুন্দর। খালের মতো। সেখানে মনে হয় নৌকা বাধা যেটায় আজ তাদের ঘুরার পরিকল্পনা৷ নবনী দেখলো কাওসারের সাথে একটা ছেলে এসেছে। ছেলেটার চেহারায় একটা গম্ভীর গম্ভীর ভাব আছে। গায়ের রং শ্যামলা। নানীজান দেখলে নিশ্চিত বলে উঠতেন৷ "গায়ের রং ওমন ময়লা কেনো?"।

কিন্তু রাজীন খুব আগ্রহ নিয়ে নবনীর দিকে তাকিয়ে আছে৷ কারণ নবনীর চোখের মণি সম্পুর্ণ নীল। সেটা দেখে রাজীন এর খুব ভয় হচ্ছে৷ সে ভুত বিশ্বাস করে না তবে কেন জানি নবনীকে তার জিন মনে হচ্ছে। তার কোনো আঙুল এর নখে চাপ দিলে নিশ্চিত হওয়া যেতো সে আসলেই জিন কিনা৷ সে এই উপায় তার মক্তবের হুজুরের কাছে শুনেছিল।



নীতি এবং রাফিন আলাদা করে ছবি তুলছে৷ নবনীকে ডাকছেও না৷ নবনীর কাছে ব্যপারটা ভালো লাগছে না। তাদের নৌকাটা তীরে বাধা৷ আর মাঝি নৌকাতে বসে পান চিবুচ্ছে আর নখ দিয়ে দাত পরিস্কার করছে৷ আবার কিছুক্ষন পর সেই নখ দিয়ে নাকও চুলকাচ্ছে৷ নবনীর এই দৃশ্য থেকে চোখ সরালো। হাটতে লাগলো দূরে দেখতে পেল সেই ছেলেটি একা বসে আছে। কাওসার একটু কাজে দূরে গিয়েছে তাই হয়তো একাই বেঞ্চিতে বসে আছে৷ নবনী কাছে গিয়ে দেখলো রাজীন চোখ বন্ধ করে বসে আছে। নবনী কিছু না ভেবে জিজ্ঞেস করলো।

- আপনি কি ধ্যান করছেন?

- না। আমি নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করছি।

- কিভাবে?

- এই বাতাস। বাতাস এর কথা শুনার চেষ্টা করছিলাম। তারা চায় আমার সব ক্লান্তি তাদের সাথে করে নিয়ে যেতে৷


নবনী ভাবতে লাগলো ছেলেটা গম্ভীর তাই গম্ভীর গম্ভীর কথা বলছে৷ এটাই কি গম্ভীর মানুষ গুলোর মেয়ে পটানোর প্রক্রিয়া! হঠাৎ রাজীন নবনীকে একটা প্রশ্ন করে বসলো।

- আপনি কি রাফিন নামে লোকটাকে পছন্দ করেন?

- মানে?

- আপনার মানে বলার ভংগীতে বোঝা যাচ্ছে পছন্দ করেন। তবে একটা কথা বলি সে আপনাকে পছন্দ করে না৷ চান্সও নেই কারণ সে আপনার বান্ধবী নীতিকে পছন্দ করে। আপনি কি প্রমান পেতে চান?


নবনী চুপ। সে অবাক হয়ে৷ তার বসে থাকার ভংগী দেখে মনে হচ্ছে সে কথা গুলো আগে থেকেই জানতো। নবনীর চুপ করে থাকা দেখে রাজীন বলে উঠলো।

- কাওসার আমাকে মেসেজ দিয়েছে সে কাজে আটকে গেছে আসবে না৷ নীতিকেও নিশ্চয়ই মেসেজ দিয়েছে। আপনি এখন জান। দেখবেন তারা আপনাকে নৌকাতে নিতে চাবে না৷ একা যেতে চাবে।  

এই কথা শুনার পর নবনী সেখান থেকে উঠে গেলো। কোনো কথা বললো না।

এদিকে রাজীন অনেক খুশি। কারণ এই জায়াগাটায় সে একা বসে থাকতে চেয়েছিল। কাওকে ভাগ দিতে চাচ্ছিল না। এখন ভালোই হয়েছে। এক ঢিলে দুই পাখি৷ মেয়েটাকে ভয় দেখানোও গেলো। সাথে জায়াগাটাও সে এখন একা উপভোগ করতে পারবে।


নবনী নৌকার কাছে আসতেই নীতি বলে উঠলো।

- নবনী কাওসার আসবে না।ওকে যে কেনো আমাদের ঘুরানোর দায়িত্ব দিয়েছি। আল্লাহই জানে৷ তুই আর রাফিন যা ঘুরে আয় নৌকা দিয়ে। আমার মাথা ব্যথা করছে৷

রাফিন খুব আহত চোখ নিয়ে বলে উঠলো

- বলো কি! প্ল্যান যেটা ছিল সেটা না হলে প্ল্যান  ক্যন্সেল। তুমি না গেলে কেও ই যাবো না।


নবনী সে সময় বলে উঠলো।

- তোমরা যাও। নীতির কিছুই হয়নি। আমার বরং পায়ে একটু ব্যথা করছে।

- সিওর?  

- হুম।

নীতি আর রাফিন এর নৌকা টা চলছে। নবনীর খুব কান্না পাচ্ছে। সে আগের জায়গায় গেল কিন্তু রাজীন কে পেল না। থাকলে হয়ত নবনী বলতো। "আপনি নীতি-রাফিনের ব্যপারটা প্রমাণ করতে পারেন নি কিন্তু প্রমাণ কিভাবে যেনো হয়ে গেছে"। নবনী সেই জায়গাটায় বসলো তার এখন কাজ বাতাসের কথা শুনা ।  

রাজীন এর খুব রাগ উঠছে৷ কারণ তার পছন্দের টং টা ভেঙে দেওয়া হয়েছে৷ সে সেটা অবশ্য আগে জেনেছে কিন্তু এখন রাগ উঠছে। শুনেছে টং এর মামা নাকি খুলনা অফিসার্স ক্লাবের পিছনে একটি চায়ের দোকান দিয়েছে। সেখানে এখন যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আকাশ অত্যন্ত মেঘলা৷ যদি বৃষ্টি নামে। ভালোই হবে৷ চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে বৃষ্টি দেখা যাবে৷ নবনী মেয়েটাকে ডাকা গেলে ভালো হতো। একটু অস্বস্তিকর কথা তাদের মধ্যে হয়েছিল তবে তা ভুল ছিল না। আচ্ছা মামার টং এর দোকানটি কি টিনের! টিনের হলে অনেক ভালো হয়৷ শীলা বৃষ্টি হলে। টিনের টুং টাং শব্দের সাথে চা খাওয়া যাবে।

নবনীর মেজাজ অসম্ভব খারাপ সে একটু আগে নীতির ফোনে রাফিনের মিসড কল দেখেছে৷ কিন্তু নাম্বার টা রাফিনের নামে সেভ করা না। অন্য নামে সেভ করা। কি নাম সেটা সে মনে করতে চাচ্ছে না। কাওসার তাকে একটি চায়ের দোকান এর নাম বলে গেছে। কিন্তু সেখানে যাওয়া সম্ভব হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না কারণ আকাশ মেঘলা। আজ বৃষ্টি হলে ভালোই হয়। বৃষ্টিতে ভেজা যাবে কিচ্ছুক্ষন।

টিনের চায়ের দোকান। মামার ছেলের নাম ছিল মনসুর। যে কিছুদিন আগে কুকুর এর কামড়ে মারা গেছে। মামা দোকানের নাম দিয়েছে মনসুর চা বিলাস৷ নামটা মিলে নি। মামা নাকি একদিন এই রাস্তায় তার ছেলেকে হাটতে দেখেছে। এরপর এই ব্যবস্থা। খুব বিস্ময়কর ব্যপার হলো বৃষ্টি হয়নি বরং রোদ উঠেছে৷ যা খুব বিরক্তিকর। আর তার থেকেও বিরক্তিকর হলো তার সামনে নবনী নামে মেয়েটি বসে আছে। তাদের দেখা হওয়ার ব্যপার টাও সে বুঝে উঠতে পারছেনা। মেয়েটি মায়াবি। তার পরনে আছে সাদা একটা কামিজ আর জিন্স৷ মাথায় মনে হয় বেনী করা৷ সে মেয়েটির সাথে কথা বলতে পারছে না কারণ মেয়েটির চোখের মণি নিল রঙের। চোখের দিকে তাকাতে তার খুব ভয় হচ্ছে৷ হঠাত নবনী বলে উঠলো।

- আপনার সেই উপায় অবলম্বন করেছিলাম। বাতাসের কথা শুনার৷

- ওহ৷ তো আমার প্রমাণ কি ঠিক ছিল?

- জ্বী।

কিছুক্ষন নিরবতার পর রাজীন বলে উঠলো।

- আপনি কি আসলেই তাকে পছন্দ করতেন?

- জানি না। শুধু জানি আমার চারটা বিয়ে ভেঙেছে তাই যেকোনো উপায়ে বিয়ে করতে হবে।

- ওহ। কি কারণে বিয়ে ভেঙেছে?

- কারণ আমার মা খারাপ মহিলা ছিল।

বলে নবনী খানিকটা আঁতকে উঠলো। সে কেনো এসব বলছে লোকটাকে৷ সে জানে না। কিন্তু তার কেন জানি এ বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে৷ মাঝে মাঝে অপরিচিত মানুষের সাথে ব্যক্তিগত কথা বলতে ভালো লাগে৷ আচ্ছা লোকটি কি খুব অবাক হয়েছে। কেন জানি তার দিকে তাকাতে ইচ্ছা করছে না। অন্য দিকে তাকিয়েই নবনী নিজ থেকেই বলে উঠে।

- আমার যখন ৩ বছর তখন মা পাগল হয়ে যান৷ আর আমি বাবার আদর কি তা জানি না৷ মানুষের কাছে শুনেছি তিনি আমাকে দেখতে পারতেন না৷ তিনি মনে করেন আমি আমার মায়ের কোনো পাপের ফল। মা মারা গেলেন আমাকে প্রথম স্কুল ব্যাগ কিনে দেওয়ার পরের দিন৷ আমার তখন ৬ বছর বয়স। বাবা আমাকে নানীজান এর বাসার সামনে ফেলে চলে গেলেন৷ নানীজান কাপড় শুকাতে ছাদে গেলেন। আমাকে দেখলেন৷ এর পর থেকে নানীজান এর সাথেই আমি থাকি। পরে অবশ্য বাবা আরেকটি বিয়ে করেন৷ কিন্তু আমি তার কোনো খবর জানি না৷

এটুকু বলে নবনী থামলো। রাজীন এর দিকে তাকালো। রাজীনের মধ্যে অবাক হওয়ার কোনো চিহ্ন দেখলো না বরং সে তৃতীয় কাপ চা খুব আয়েশ করে খাচ্ছে৷ হাতে একটা সিগারেটও আছে। সে সিগারেট টা ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো।

- আপনার আর আমার মধ্যে অসম্ভব একটা মিল আছে। কি জানেন? আপনার মা ছিলেন খারাপ মহিলা আর আমার বাবা।


নবনীর মনে হচ্ছিল রাজীন নামের ছেলেটির মুখে একদলা থু থু মারতে কিন্তু তা সম্ভব না৷ নবনী আর এক মূহুর্তের জন্য সেখানে বসলো না। উঠে চলে গেলো।

রাজীন তার চলে যাওয়া দেখছে আর ভাবছে। মানুষকে আহত করতে তো অনেক ভালো লাগে। তবে সে কোনো মিথ্যে কথা বলেনি৷ কারণ তার বাবা আসলেই একজন খুনি যিনি কিনা তার মাকে খুন করে তিন বছর জেলও খেটেছেন। কিন্তু রাজীন এ কথাটি বিশ্বাস করতে পারতো না। সে মনে করতো তার মায়ের সাধারণ মৃত্যু ই হয়েছে৷ কিন্তু এখন সে এটা বিশ্বাস করে। কারণ সে প্রমাণ পেয়েছে তার বাবা আসলে একজন পিশাচ শ্রেনীর লোক এবং মানসিক বিকারগ্রস্থ। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছুদিন পর একদিন রাজীন খেয়াল করলো তার বাবা বাথরুমে কফি নিয়ে জান এবং বাথরুমে থাকা অবস্থায় তার কফি খাওয়ার শব্দও পাওয়া যায়৷ রাজীন বুঝেছিল তার বাবা মানসিক ভাবে অসুস্থ। একদিন রাজীন তার বন্ধু অসুস্থ থাকায় তার ছোট বোনকে রিকশা করে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে এসেছিল। বাসায় আসতেই তার বাবা তাকে বলে উঠলো "মনে অনেক জ্বালা! মেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো!" বলেই বাথরুমে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে আটকে দিলেন৷ দরজা খুললেন ২৭ ঘন্টা পর। দরজা খুলে তিনি রাজীনকে প্রশ্ন করলেন৷ "কিরে বাবা তুই এখানে। আমি তোর জন্য নাস্তা করে রেখেছি। আমি ভেবেছি তুই না খেয়েই কলেজে চলে গেছিস।" রাজীন কিছু বলেনি সে দৌড়ে খেতে চলে গেলো। কারণ সে গত ২৭ ঘন্টা শুধু পানি আর তার বাবার খাওয়া হাফ গ্লাস কফি খেয়েছিলো। তার বড় বোন পড়াশুনা করতো রাজশাহী ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগে৷ একদিন বাবা খুব জরুরিভাবে তার বোনকে ডেকে আনলেন ঢাকায়। তখন রাজীনের এইচএসসি শেষ। রাজীন তার বোনকে তখনো বাবার ব্যাপারটা জানায় নি৷ তার বোন বাসায় আসার কিছুক্ষন পর তার বাবার অফিসের ডিরেক্টর আমজান হোসেন এসে উপস্থিত হলেন একজন হুজুর মতো মানুষ নিয়ে৷ তিনি নাকি বিদেশ চলে যাবেন তার ৬ বছরের মা হারা ছেলেকে নিয়ে৷ যাওয়ার আগে কোম্পানীটা তিনি নাকি কোম্পানিটা রাজীনের বাবার হাতে তুলে দিতে চান৷ কিছুক্ষন পর রাজীনের বাবা এসে রাজীন কে ধমক দিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিলেন৷ রাজীন রুমে বসে শুনতে পেলো ড্রয়িং রুম থেকে তার বোনের কান্নার আওয়াজ এবং হুজুর লোকটার কিছু দোয়া৷

শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে তার বোন রাজীন এর হাতে একটি রিং দিয়ে বলেছিল "আসাদ নামে কেও একজন আসবে। তাকে এটা দিয়ে দিস। ভালো থাকিস ভাই।" পরের দিন আমজাদ হোসেন রাজীনের বোন এবং তার ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন কানাডা এবং তার বাবা হয়ে গেলো অফিসের ডিরেক্টর। তবে আসাদ নামে কাওকে আর আসতে দেখা যায় নি৷ কিন্তু কিছুদিন পর হঠাৎ তার বাবা ব্রেন স্ট্রোক করলেন৷ একদম বিছানায় পরে গেলেন৷ এরপর থেকে ক্রমাগত রাজীন এর মা রাজীন এর স্বপ্নে আসতেন আর উপদেশ দিতেন মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎও বলে দিতেন৷ যেমন একদিন বললেন। "বাবা তুই কুয়েটে পরীক্ষা দিয়ে আয়, দেখবি চান্স পেয়ে গেছিস।" রাজীন প্রিপারেশন নিয়ে তার বাবাকে একা রেখে কুয়েটে পরীক্ষা দিতে রাতের ট্রেন এ উঠে। ট্রেনে ঘুমানোর সময় সে স্বপ্নে দেখে  তার মা তাকে বলছে "আজকে রাতে তোর বাবা মারা যাবে।" পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েই সে খবর পায় তার বাবা মারা গেছেন সকালের দিকে লাশ থেকে পঁচা গন্ধ বের হওয়ায় রাজীনের ঢাকা ফেরার আগেই তার বাবাকে দাফন করে দেওয়া হয় এলাকার কবর স্থানে। তবে সে মায়ের স্বপ্নে আসার ব্যপারটার যুক্তি দাড় করিয়েছিল। মূলত মানুষ এর মস্তিষ্ক কল্পনা করতে ভালোবাসে৷ সে তার মাকে নিয়ে সবসময় কল্পনা করতো এবং বাস্তবতার অনেক কিছুই সে ধারণ করতে পারতো বাকি ৫ টা মানুষের মতোই যার জন্য এমন স্বপ্ন দেখতেন৷ এসব ভাবার সময় তার ফোনে একটি মেসেজ এলো। আগে আরেকটি মেসেজ এসেছিল তার বোনের। মোবাইল হাতে নিতে যেয়ে দেখলো একটা ছোট্ট প্যাড। যেটা নবনীর। আচ্ছা প্যাড টা কি পড়া উচিত?              


নবনীর মেজাজ অত্যন্ত খারাপ। সে সুটকেসের সামনে একটি প্যাড পেয়েছিল সেটা হাতে নিয়েছিল পড়ার জন্য। কিন্তু পড়া হয়নি৷ সেটা সসম্ভবত তার মায়ের। আজ রাতে তারা ঢাকা চলে যাবে। তার সেই প্যাড এর লেখা পড়ার কোনো ইচ্ছা তবু সেটা তার মায়ের একটা জিনিস। হঠাৎ নীতি এসে বললো

- আমরা লাঞ্চটা সবাই একসাথে করবো। কোথায় করবো সেটা দেখার জন্য আমি আর রাফিন বের হলাম। রাজীন নামের লোকটা মনে হয় আসবে। আমি রেস্টুরেন্ট এর নাম তোকে মেসেজ করলে তুই ওনাকে নিয়ে চলে আসিস। উনি মনে হয় এখানেই আসবে৷ কাওসার ক্লাস করে এসে পরবে।


নীতি চলে যেতেই নবনীর অনেক রাগ হলো। রাগটা হলো রাজীন নামের লোকটার কারণে। কালকের কাহিনী সে এতো জলদি ভুলবে না। এসব ভাবতে ভাবতেই রাজীন এসে পরলো। নবনী খোটা দেওয়ার সুরে বলে উঠলো।

- আরে আসুন আসুন।

- আপনাকে আমার একটা জিনিস দেওয়ার ছিল।

- কি!

- আপনি কাল রেখে গিয়েছিলেন৷ একটা প্যাড৷ আচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

- করেন।

- আপনার মায়ের চোখের মণি কি নীল ছিল?

- না। কিন্তু মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন? বাবারটা তো নীল হতে পারে।

- অনুমান। আচ্ছা আমি আসি। আমার ট্রেন একটু পর। রাতের মধ্যে ঢাকা ফিরতে হবে কাজ আছে। আপনার বান্ধবী কে সরি বলে দিবেন।

- আপনার ফোনের মহিলাটি কি আপনার মা?

- জ্বী। তিনি মারা গেছেন।

- সরি। আপনি কি তাকে অনেক বেশি মিস করেন?

- আমি তার হাতের লাল শাক খুব মিস করি। এখন বাইরের খাবার ই খাওয়া হয়। বাসায় তৈরী লাল শাক এর স্বাদ ভুলেই গেছি৷

কিছুক্ষন নিরবতার পর রাজীন আবার বলে উঠলো।

- আপনি কি প্যাড টা পড়েছেন। আমার মতে সেটা আপনার পড়া উচিত।

- অন্যর কিছু পড়া যে অপরাধ সেটা কি আপনি জানেন?

- সরি। আসি।

নবনীর খুব বমি বমি ভাব আসছে। ট্রেনে এক সমস্যা। আলো সবসময় জ্বালিয়ে রাখে তাই ঘুমানো যায় না। তবে তার অসস্থি লাগার অন্যতম কারণ সে কিছুক্ষন আগে তার মায়ের প্যাড টি পড়েছে। তার মায়ের হাতের লেখা অনেক সুন্দর। যেনো মনে হচ্ছে মুত্তা লাগানো। সব পৃষ্ঠায় কবিতা অথবা কিছু বাক্য লিখা। মাঝে সে একটি চিরকুট পায় যেটায় লিখা। "বাবু সাহেব, আপনি কবে আসবেন? " নিচে একটি ঠিকানা দেওয়া। গাজীপুর এর। নবনী সিদ্ধান্ত নিল সে পরশু সেই ঠিকানায় যাবে।

রাজীন একটা বিষয়ে বার বার চিন্তা করছে। নবনী তার ফোনের ওয়ালপেপার এ তার মায়ের ছবি আছে এটা জানলো কিভাবে! তার থেকেও বড় কথা সে গতকাল তার মায়ের বদলে বাবা কে দেখেছে স্বপ্নে। তিনি ধমকের সুরে বলছেল "নবনীর সাথে তোর আবার দেখা হবে।" ঘুম থেকে উঠে সে এটাও বুঝতে পারছেনা তার বাবা এ কথা তাকে ধমক দিয়ে বললেন কেনো।    

নবনী সেই ঠিকানার বাড়িটির সামনে দাড়িয়ে আছে। বাড়িটি পুরনো। দরজায় বেল দিতেই একটা সানগ্লাস পরা লোক লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বয়স্ক। নবনী বুঝতে পারে না এই সন্ধ্যায় তিঞ্জ সানগ্লাস কেনো পরেছেন। নবনী তাকে বললো।

- আমার মায়ের একটা চিঠির শেষে এই ঠিকানা ছিল।

লোকটি চিরকুট পরলো তারপর নবনীকে বসতে বললো ড্রয়িং রুমে৷ কিছুক্ষন পর দু কাপ চা আর কিছু বিস্কিট নিয়ে লোকটি এলো। বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো।

- তোমার মা কেমন আছেন?

- আমার ছয় বছর বয়সে তিনি মারা গিয়েছেন৷ শেষ সময় তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। এই চিঠি টা কাকে লিখা আমি তার সম্পর্কে জানতে চাই।

লোকটি একটি দীর্ঘশ্বাস নিলেন একটা সিগারেট ধরিয়ে বলা শুরু করলেন৷

- এটা ঠিক তোমার মায়ের বিয়ে হওয়ার প্রায় ৭ মাস আগের কাহিনী। তোমার মায়ের বাসার পাশের বাসায় থাকতো শায়লা নামের তার এক বন্ধবী। সেই শায়লার চাচাতো ভাই ছিল অয়ন। সে থাকতো ঢাকায়। আর তোমার মায়ের বাসা ছিল টঙ্গি তে। শায়লার বিয়ে ঠিক হয়৷ বিয়ের ৭ দিন আগেই অয়ন তাদের বাসায় যায়৷ কিন্তু থাকার কোনো জায়গা ছিল না। তো অয়ন এর জায়গা হয় তোমার আম্মুর বাসার উপরে ছাদের সাথে একটা রুমে। তোমার আম্মু বিভিন্ন কাজে ছাদে গেলো দেখতো অয়ন নামের লোকটা কিছু আঁকছে। একদিন তোমার নানু তোমার আম্মুকে বললো এক বাটি পায়েস দিয়ে আসতে। তোমার আম্মু পায়েস দিতে গিয়ে দেখলো অয়ন অনেক ছবি একে রুমের দেয়ালে লাগিয়ে রেখেছে এবং আরেকটি ছবি আঁকার কাজ করছে৷ তোমার আম্মু পায়েস দিয়ে বের হবে এমন সময় অয়ন জিজ্ঞেস করলো।

- আপনার নাম টা কি?

- সুপ্রভা আহমেদ

- বাহ সুন্দর নাম৷ আপনার চোখ গুলা অনেক সুন্দর।

- আর আপনার গুলা ভয়ংকর।

বলেই দৌড় দিয়ে চলে গেলো। এরপর এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। বিয়ের আগের দিন হঠাৎ কারেন্ট চলে গেলো৷ ঝড় হচ্ছিলো। তোমার আম্মু মোমবাতি নিয়ে অয়ন এর রুমে গেলো। অয়ন তোমার আম্মুকে বললো।

- মোমবাতি গুলো দিন৷ কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না।

- দেখা যাওয়া লাগবেনা৷ মোমবাতি জ্বালানো লাগবে না।

- সুপ্রভা আপনি দয়া করে রুম থেকে চলে যান। প্লিজ চলে যান।

ঝড়ের বেগ বেড়ে গেলো। পাশের একটি গাছ সেদিন ভেঙে গিয়েছিল।


লোকটি আরেকটি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন।

- এর পর তোমার আম্মুর কাছে অয়ন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হলেন। শায়লার বিয়ের দিন গিফট নিয়ে আলাদা গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছিল অয়ন। হঠাত একটি ট্রাক সেই গাড়িতে ধাক্কা দিল। অয়ন প্রায় মারা যাবার মত অবস্থা। তার বাম চোখ নষ্ট হয়ে গেলো। বাম পাটাও অযথা শরীরের সাথে জুরে রইলো। সুস্থ হতে হতে প্রায় ৬ মাস চলে গেলো। এরপর খোজ নিয়ে জানতে পারলেন তোমার মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে।

নবনী স্তব্ধভাবে তার কথা গুলো শুনছিলো। তবে তার মা কোনো খারাপ মহিলা ছিলেন না এটা নিশ্চিত হতে পেরে তার ভালো লাগছে ৷ নবনী রাস্তা ধরে হেটে চলছে৷ পিছে ফিরে তাকালো৷ বাড়িটির বারান্দায় লোকটি দাঁড়িয়ে আছে৷ তার চোখ দিয়ে সানগ্লাস এর নিচ দিয়ে পানি পরছে। তিনি চোখ মুছার জন্য সানগ্লাসটি খুললেন৷ তার বা পাশের চোখটা নষ্ট। কিন্তু ডান পাশে চোখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সেই চোখটা অত্যন্ত সুন্দর এবং চোখটার মণির রং নীল।


আজ ২৯ মে। একটি বিশেষ দিন। আজ রাজীনের জন্মদিন। রাজীনের সাথে "মনসুর চা বিলাস" এ চা খাওয়ার সময় তার বোনের একটা মেসেজ আসে। "কিরে ভাইয়া, কেমন আসিস। ২৯ মে তো এসেই পরলো। জন্মদিনে প্লেন কি? "

সে সময় মোবাইলের ওয়ালপেপারে তার মায়ের ছবিটি দেখেছিল। কারো মেসেজ পড়া একদম ঠিক না। কিন্তু রাজীনও তার মায়ের প্যাড পড়েছে এটাও তো ভুল। ভুল ভুল কাটাকাটি। কাওসার এর কাছ থেকে রাজীনের বাসার ঠিকানা নিয়েছে৷ নবনী এখন রাজীনের বাসার সামনে দাড়ানো এবং তার হাতে একটি বাজারের ব্যাগ যাতে আছে ২ কেজি লাল শাক।