ঢাকা, রবিবার ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ , বাংলা - 

এখন এ সব শুধু স্বপ্নের মত গল্প মনে হয়

এম শামসুদ দোহা

শুক্রবার ২৫শে জানুয়ারী ২০১৯ দুপুর ১২:৫০:৩১

যুগের অত্যাধুনিকতার সাথে সাথে অনেক কিছুই ইতিহাস হয়ে যায়। কৃষক আঁউস এবং আমন ধান কেটে এনে বাড়ী উঠানে (আংগিনায়) এভাবে গরু দিয়ে মাড়াই করে ধানগাছ থেকে ধান ছাটাই করতো, আর এইকাজে সহযোগিতা করতো কৃষাণীরা ও পরিবারের ছোট বড় সবাই, সবার মাঝে ছিলো আনন্দ আর উদ্দিপনা । যা আজ অতীত হয়ে গেছে ।

উপজাতি (আদিবাসী) মেয়েরা সাধারণত উপজাতি ছেলেদের তুলনায় কঠোর পরিশ্রমী, এটাই তার একটা নমুনা ।

গ্রামের গৃহিনীরা ঢেঁকি দিয়ে আতপ চাউলের গুড়া তৈরী করছেন শীতের পিঠা বানানোর জন্য।

একসময় মাটিতে এভাবে কিছু বিছনাপাটি বিছিয়ে কলাপাতায় করে খাওয়া হতো বিভিন্ন দাওয়াতে । বর্তমান যুগে যা একেবারে বিলুপ্ত।

মহান আল্লাহ্-র অশেষ নেয়ামত, শীতকালে খেজুর গাছের সুস্বাদু এবং সুমিষ্ট রস কার না ভালো লাগে।

একসময়ে এইদেশের জনগনের একমাত্র যান্ত্রিক বাহন ছিল এই বাস।। ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড কোম্পানীর তৈরী এইবাস চালু করতে লাগতো একধরনের 'হ্যান্ডেল'। বাসের হেলপার হ্যান্ডেল দিয়ে ইঞ্জিনের সামনে বিশেষস্থানে লাগিয়ে প্রথমে আস্তে আস্তে করে ঘুরিয়ে পরে ঘুরানোর গতি বাড়িয়ে একসময় খুব জোরে ঘুরিয়ে এই বাসের ইঞ্জিন চালু করতো, যা এখন পুরাই ইতিহাস।

আগের যুগের খড়ম আপনাদের কি মনে পড়ে ঘরে নিজেরা পাদুকা হিসাব ব্যবহার করতো এবং মেহমান আসলে পা ধোয়ার জন্য দিত। এখন সোনারগাঁ এর যাদুঘরে আাছে।

" ঘানি " মানে কষ্ট। দীর্ঘকাল বা দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টকে বহন করে চলাকে ঘানি বলে। ছোট বেলায় বাবার মুখে শুনেছি সংসারের ঘানি টানতে টানতে বাবার অতিষ্ট হবার কথা। মায়ের মুখে শুনেছি রান্না ঘরের হাড়ি সামলানো ঘানির কথা। মোট কথা ছোটকাল থেকে এই ঘানির সাথে আমরা এমন ভাবে পরিচিত যে, বড় হয়ে আজ এই ঘানি নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে, হাজার চেষ্টাতে ও মুক্ত হতে পারছি না। সরষে দানা থেকে খাঁটি সরিষার তেল সংগ্রহের সময়তো এখনই। এই ভাবে চরকির মধ্যে সরিষা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে কলুর বলদ এই ঘানি টেনে নিয়ে বেড়ায়। বারং বার সরিষা পিষে ফোঁটা ফোঁটা খাটি সরিষার তেল সংগ্রহ করা হয়। যা ১০০% খাঁটি ঘানির তেল। বড়ই ফলদায়ক। ভেজাল তেলের বাজারে খাঁটি ঘানির তেল পাওয়া অতিভ কষ্টকর। কলুর বলদের কষ্টের ফসল ফোঁটা ফোঁটা ঘানির তেল বহু রোগের ঔষধ, অল্পতেই অনেক কার্যকরী। এটা আমাদেরকে এই শিক্খা দেয় যে কষ্টের ফসল সামান্যতেই অনেক যা ভেজালে পাওয়া প্রায় অসন্ভব।

একসময়ে গ্রামেবাড়ীতে বিয়ের অনুষ্ঠানে আতপ চাউলের গুড়া দিয়ে হাতে তৈরী পিঠা পরিবেশন করা হতো । বিয়ের পিঠা বানানোর জন্য গ্রামের তরুণীরা দলবদ্ধ হয়ে ঢেঁকি দিয়ে আতপ চাউল গুড়া করতো এবং বিয়ের গান গেয়ে গেয়ে আনন্দ উৎসব করতো । এটা সেই চিত্র, যা নতুন প্রজন্মের নিকট শুধু ইতিহাস।

গরু, নাংগল ও মই আগেকার দিনে কৃষকদের জমি চাষের জন্য ছিল প্রধান ও একমাত্র উপকরণ। অথচ বর্তমান যুগে অাধুনিকতার তালে তালে চাষের এই সব উপকরণ হারিয়ে যাচ্ছে । বর্তমান যুগে জমি চাষ করা হয় ট্রাক্টর দিয়ে । কাঠের তৈরী নাংগল ও বাঁশের তৈরী মই জমি চাষের এই উপকরণগুলো দেখতে হলে একসময় যাদুঘরে যেতে হবে ।

" বায়োস্কোপ " আমাদের ছোট্ট বেলার সিনেমা হল। হাট বারে গ্রাম্য হাটে এবং মৌসুমী গ্রামীন মেলায় এই সিনেমা দেখার সুযোগ মিলতো। দশ পয়সা কিংবা চার আনা দিয়ে ভীড় ঠেলে এই সিনেমা দেখা হতো, হামাগুড়ি দিয়ে বসে টিনের বাস্কোর গোল মুখে চোখ রেখে অধির আগ্রহে বসে থাকা, আর হলের মালিক বাস্কের ভিতর কপি বাতি জ্বালিয়ে তার আলোয় নায়ক নায়িকার ছবির পোষ্টার দেখায়ে হাতে করতাল নিয়ে নেচে নেচে ছবির বর্ননা দিত। সেই সিনেমা দেখার কি আনন্দ, কি অনুভুতি, যা মনে পড়লে আজও শিহরিত হই। ইচ্ছে হয় ছুটে যাই হারানো দিনে। আজকের ডিস, স্যাটেলাইটের এই কৃত্রিম মাধ্যম আমাদেরকে কি আর বায়োস্কোপের সেই মিষ্টিি মাখা আনন্দ দিতে পারে!!!

একসময়ে দেশের মানুষের বাহনগুলির মাঝে গরুর গাড়ীও বাহন হিসাবে ছিলো অন্যতম , যা এখন যুগের তালে তালে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে ।

" লালচে মুড়ি " দেখতে কদাকার হলেও ১০০% ভেজাল মুক্ত খাঁটি মোখরোচক খাবার। বাজারের ধবধবে সাদা ভেজালযুক্ত মুড়ির চেয়ে স্বাদেও অতুলনীয়। এই শীতে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে ধুম পড়ে মুড়ি ভাজার। মা বোনেরা হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও এই মুড়ি ভাজার পর্ব ঠিক সামলিয়ে নেয়। সঠিক উপকরন মিশ্রিত করার ফলেই তো চাউল ঠিক ভাবে ফুটে খাঁটি মুড়ি বেরিয়ে আসে। আর এই মুড়ি দিয়ে চলে শীতের মুখরোচক নানা রকমের খাবার। গুড় মুড়ি, মুড়ির মোয়া এরকম বহু রকম মুড়ির খাবার দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা কিংবা সকাল বিকেলের নাস্তা পর্ব সন্পূর্ন হয়। শীত এবং মচমচে মুড়ি এ দু'টোতে বাংলা মুখরিত, পিঠা পাবন কিংবা অতিথি আপ্যায়ন এ সময়ের বাংলার ব্যস্ত রূপ, অপরূপ।