ঢাকা, বুধবার ১৯ই জানুয়ারি ২০২২ , বাংলা - 

অপরাধ প্রমাণ হলেই এস কে সিনহার যে শাস্তি

স্টাফ রিপোর্টার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম

2021-10-04
অপরাধ প্রমাণ হলেই এস কে সিনহার যে শাস্তি

ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর)। মামলার ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। রায়ের আগে আসামিপক্ষ আশা করছে বেকসুর খালাস পাওয়ার। তবে দুদকের প্রত্যাশা আসামিরা পাবেন সর্বোচ্চ শাস্তি।

আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ধারাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এ মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সফিউদ্দিন আসকারী আহমেদ, রণজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায় পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করা হয়নি। অন্য সাত আসামি তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করেন।

যে ধারার যে শাস্তি
দণ্ডবিধি ৪০৯ ধারায় বলা আছে, ‘সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকার, বণিক বা প্রতিভূর অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গকরণ কোনো ব্যক্তি যদি সরকারী কর্মচারী হিসেবে তার পদমর্যাদা বলে অথবা ব্যাংকার, ব্যবসা, ফ্যাক্টর, দালাল, অ্যাটর্নি বা প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসায় সূত্রে কোনোভাবে কোনো সম্পত্তির জিম্মাদার হয়ে বা উক্ত সম্পত্তির পরিচালনের ভারপ্রাপ্ত হয়ে সে সম্পত্তি সম্পর্কে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে, তবে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা দশ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।’

মানিলন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি মানিলন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানিলন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বছর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লাখ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

‘মানিলন্ডারিং আইনের ৪(৩) ধারায় বলা আছে, আদালত কোনো অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসেবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানিলন্ডারিং বা কোনো সম্পৃক্ত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্ট।’

দুদক আইনের ৫(২) ধারায় বলা আছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী অপরাধমূলক অসদাচরণ করিলে বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করিলে তিনি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের যোগ্য হইবেন।’

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মীর আহম্মেদ আলী সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন প্রত্যাশা করছি। আশা করছি রায়ে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

তিনি আরও বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে তিন ধারায় অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি তিন ধারায়ই আসামিদের শাস্তি দেওয়া হবে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহিনুর রহমান বলেন, আসামি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী) ও ফারমার্স ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হকের বিরুদ্ধে দুদক অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। আশা করছি আসামিরা খালাস পাবেন।

তিনি বলেন, অভিযোগে বলা হয়েছে বাবুল চিশতীর প্রভাবে ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কাগজে তিনি স্বাক্ষর করেননি। কোনো কাগজে তিনি সুপারিশও করেননি। এছাড়া লুৎফুল হক এত বড় ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে নেগেটিভ মার্ক করেছেন। তাই আশা করছি রায়ে আসামিরা খালাস পাবেন।

এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) জন্য এ দিন ধার্য করেন।

গত ২৯ আগস্ট একই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে সাত আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন এবং আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। তারা জামিনে আছেন। সাত আসামি হলেন- ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা।

মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সফিউদ্দিন আসকারী আহমেদ, রণজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায় পলাতক থাকায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। এ মামলায় ২১ সাক্ষীর প্রত্যেকেই আদালতে সাক্ষ্য দেন।

২০১৯ সালের ১০ জুলাই ঋণ জালিয়াতি ও চার কোটি টাকা আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগে এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলা করা হয়। মামলার বাদী দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর আদালতে এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

দুদক সূত্রে জানা যায়, আসামি মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় দুটি চলতি হিসাব খোলেন। ৭ নভেম্বর তারা দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ আবেদনপত্রে দুজনই বাড়ি নম্বর ৫১, সড়ক নম্বর ১২, সেক্টর ১০, উত্তরা আবাসিক এলাকা- এ ঠিকানা উল্লেখ করেন। ওই বাড়ি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ঋণ আবেদনে জামানত হিসেবে রণজিৎ চন্দ্র সাহার স্ত্রী সান্ত্রী রায় সিমির সাভারের ৩২ শতাংশ জমি দেখানো হয়। এ দুজনই এস কে সিনহার পূর্বপরিচিত। ঋণ আবেদন দুটি কোনোরকম যাচাই-বাছাই করা হয়নি। রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের কোনো নিয়মনীতিও মানা হয়নি।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে তোপের মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। পরে বিদেশ থেকেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।